সহীহ বুখারী হাদিস নং ১১১, ১১২, ১১৩, ১১৪ এবং ১১৫

সহীহ বুখারী ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ। এটি সংকলন করেছেন ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস সংগ্রহ করেন এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সহীহ হাদিসগুলো নির্বাচন করেন। মুসলিম উম্মাহর অধিকাংশ আলেমের মতে, পবিত্র কুরআনের পর সহীহ বুখারী সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে।

সহীহ বুখারীতে ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, নৈতিকতা, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক আচরণসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে হাদিস সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থটিতে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি হাদিস রয়েছে (পুনরাবৃত্তিসহ), আর পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে হাদিসের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজারের মতো। প্রতিটি হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীদের সততা, স্মৃতিশক্তি এবং বর্ণনার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে।

মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা এবং ইসলামী বিধান বোঝার ক্ষেত্রে সহীহ বুখারীর গুরুত্ব অপরিসীম। এই গ্রন্থের হাদিসগুলো মানুষকে আল্লাহর আনুগত্য, সৎকর্ম, ন্যায়পরায়ণতা এবং উত্তম চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেয়। যুগে যুগে ইসলামী শিক্ষা, গবেষণা ও ফিকহশাস্ত্রের ক্ষেত্রে সহীহ বুখারী একটি মৌলিক উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাই ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য সহীহ বুখারী অধ্যয়ন অত্যন্ত উপকারী ও গুরুত্বপূর্ণ।

হাদিস নং - ১১১

আরবি: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ ، قَالَ أَخْبَرَنَا وَكِيعٌ ، عَنْ سُفْيَانَ ، عَنْ مُطَرِّفٍ ، عَنِ الشَّعْبِيِّ ، عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ ، قَالَ قُلْتُ لِعَلِيٍّ هَلْ عِنْدَكُمْ كِتَابٌ قَالَ لاَ، إِلاَّ كِتَابُ اللَّهِ، أَوْ فَهْمٌ أُعْطِيَهُ رَجُلٌ مُسْلِمٌ، أَوْ مَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ‏.‏ قَالَ قُلْتُ فَمَا فِي هَذِهِ الصَّحِيفَةِ قَالَ الْعَقْلُ، وَفَكَاكُ الأَسِيرِ، وَلاَ يُقْتَلُ مُسْلِمٌ بِكَافِرٍ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আশ-শা‘বী (রহ.) থেকে বর্ণিত। আবূ জুহাইফা (রা.) বলেন, আমি আলী (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনাদের কাছে কি কোনো লিখিত গ্রন্থ (কুরআন ছাড়া) আছে?’ তিনি বললেন, ‘না, কেবল আল্লাহর কিতাব (কুরআন), অথবা কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে যে বুদ্ধি-বিবেক দান করা হয়েছে, অথবা এই কাগজের টুকরোয় যা লেখা আছে।’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই কাগজে কী লেখা আছে?’ তিনি বললেন, ‘রক্তপণ (দিয়াত), বন্দী মুক্তির মুক্তিপণ এবং এই বিধান যে, কোনো মুসলিমকে কাফিরের বিনিময়ে হত্যা করা যাবে না।’ (সহীহ বুখারী ১১১)

হাদিস নং - ১১২

আরবি: حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ الْفَضْلُ بْنُ دُكَيْنٍ ، قَالَ حَدَّثَنَا شَيْبَانُ ، عَنْ يَحْيَى ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ خُزَاعَةَ، قَتَلُوا رَجُلاً مِنْ بَنِي لَيْثٍ عَامَ فَتْحِ مَكَّةَ بِقَتِيلٍ مِنْهُمْ قَتَلُوهُ، فَأُخْبِرَ بِذَلِكَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَرَكِبَ رَاحِلَتَهُ، فَخَطَبَ فَقَالَ ‏"‏ إِنَّ اللَّهَ حَبَسَ عَنْ مَكَّةَ الْقَتْلَ ـ أَوِ الْفِيلَ شَكَّ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ ـ وَسَلَّطَ عَلَيْهِمْ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالْمُؤْمِنِينَ... (পূর্ণ হাদিস) ... إِلاَّ الإِذْخِرَ، إِلاَّ الإِذْخِرَ ‏"‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। মক্কা বিজয়ের বছর খুযা‘আ গোত্র বনী লাইস গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে (পূর্ব হত্যার বদলায়)। নবী (ﷺ)-কে এ খবর দেওয়া হলে তিনি তাঁর সওয়ারীতে আরোহণ করে খুতবা দেন এবং বলেন: “আল্লাহ মক্কায় হত্যা (বা হস্তী) নিষিদ্ধ করেছেন... মক্কায় যুদ্ধ আমার জন্য কয়েক ঘণ্টার জন্য হালাল করা হয়েছিল। এখন এটি পূর্বের মতো হারাম। এর কাঁটা উপড়ানো যাবে না, গাছ কাটা যাবে না... ইদখির ঘাস ব্যতীত।” (সহীহ বুখারী ১১২ – মক্কার পবিত্রতা সম্পর্কে বিস্তারিত)

হাদিস নং - ১১৩

আরবি: حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرٌو ، قَالَ أَخْبَرَنِي وَهْبُ بْنُ مُنَبِّهٍ ، عَنْ أَخِيهِ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ، يَقُولُ مَا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَحَدٌ أَكْثَرَ حَدِيثًا عَنْهُ مِنِّي، إِلاَّ مَا كَانَ مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ وَلاَ أَكْتُبُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী (ﷺ)-এর সাহাবীদের মধ্যে আমি ছাড়া আর কেউ তাঁর থেকে এত বেশি হাদিস বর্ণনা করেনি, শুধু আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) ব্যতীত। কারণ তিনি লিখে রাখতেন, আর আমি লিখতাম না। (সহীহ বুখারী ১১৩)

হাদিস নং ১১৪

আরবি: حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ سُلَيْمَانَ ، قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ وَهْبٍ ، قَالَ أَخْبَرَنِي يُونُسُ ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ لَمَّا اشْتَدَّ بِالنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَجَعُهُ قَالَ ‏"‏ ائْتُونِي بِكِتَابٍ أَكْتُبُ لَكُمْ كِتَابًا لاَ تَضِلُّوا بَعْدَهُ ‏"‏‏.‏ قَالَ عُمَرُ إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم غَلَبَهُ الْوَجَعُ وَعِنْدَنَا كِتَابُ اللَّهِ حَسْبُنَا... (পূর্ণ হাদিস) ... فَخَرَجَ ابْنُ عَبَّاسٍ يَقُولُ إِنَّ الرَّزِيَّةَ كُلَّ الرَّزِيَّةِ مَا حَالَ بَيْنَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَبَيْنَ كِتَابِهِ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যখন নবী (ﷺ)-এর রোগ বেড়ে গেল, তিনি বললেন, “আমার কাছে কাগজ-কলম নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জন্য এমন একটি লিখন লিখে দিব যার পর তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।” উমর (রা.) বললেন, “রোগ তাঁকে আক্রান্ত করেছে, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব (কুরআন) আছে, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট।” সাহাবীদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। নবী (ﷺ) বললেন, “আমার কাছ থেকে চলে যাও, আমার সামনে ঝগড়া করা উচিত নয়।” ইবনে আব্বাস (রা.) বেরিয়ে এসে বললেন, “সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য এই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর লিখনের মাঝে বাধা সৃষ্টি হলো।” (সহীহ বুখারী ১১৪ – মৃত্যুর সময়ের ঘটনা)

হাদিস নং ১১৫

আরবি: حَدَّثَنَا صَدَقَةُ ، أَخْبَرَنَا ابْنُ عُيَيْنَةَ ، عَنْ مَعْمَرٍ ، عَنِ الزُّهْرِيِّ ، عَنْ هِنْدٍ ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ ، قَالَتِ اسْتَيْقَظَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ فَقَالَ ‏"‏ سُبْحَانَ اللَّهِ مَاذَا أُنْزِلَ اللَّيْلَةَ مِنَ الْفِتَنِ وَمَاذَا فُتِحَ مِنَ الْخَزَائِنِ أَيْقِظُوا صَوَاحِبَاتِ الْحُجَرِ، فَرُبَّ كَاسِيَةٍ فِي الدُّنْيَا عَارِيَةٍ فِي الآخِرَةِ ‏"‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ: উম্মে সালামা (রা.) বলেন, এক রাতে নবী (ﷺ) জেগে উঠে বললেন, “সুবহানাল্লাহ! আজ রাতে কত ফিতনা অবতীর্ণ হয়েছে এবং কত ভান্ডার উন্মুক্ত হয়েছে! তোমরা ঘরের মহিলাদেরকে (নামাযের জন্য) জাগিয়ে দাও। পৃথিবীতে অনেকে পোশাক পরিহিত, কিন্তু আখিরাতে তারা উলঙ্গ হয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারী ১১৫)

উল্লেখ্য: এগুলো সহীহ বুখারীর স্ট্যান্ডার্ড নম্বরিং অনুসারে (sunnah.com)। আরবি মূল টেক্সট এবং বাংলা অনুবাদ নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুসরণ করে দেওয়া হয়েছে।

যদি আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা পরবর্তী হাদিস চান, জানান। আল্লাহ আমাদেরকে সুন্নাহ অনুসরণের তাওফীক দান করুন। আমীন।

সবশেষে বলা যায়, সহীহ বুখারী শুধু একটি হাদিস গ্রন্থ নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি অমূল্য জ্ঞানভান্ডার। এতে সংকলিত সহীহ হাদিসসমূহ ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ইমাম বুখারীর অসাধারণ পরিশ্রম, সততা এবং গবেষণার ফলস্বরূপ এই গ্রন্থটি আজও বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য। তাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা জানতে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করতে এবং নিজের জীবনকে সুন্দর ও কল্যাণময় করে তুলতে সহীহ বুখারী অধ্যয়নের গুরুত্ব অপরিসীম।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url