সহীহ বুখারী হাদিস নং ১০০, ১০১, ১০২,১০৩,১০৪ এবং ১০৫
সহীহ বুখারী হলো ইসলামী বিশ্বের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণ্য হাদিস সংকলন। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (রহ.) কর্তৃক সংকলিত এই গ্রন্থটি ‘সহীহাইন’-এর একটি (অপরটি সহীহ মুসলিম)। এতে মোট ৭,৫৬৩টি হাদিস রয়েছে (পুনরাবৃত্তিসহ), যার মধ্যে অনন্য হাদিসের সংখ্যা প্রায় ২,৬০০-এর কাছাকাছি। ইমাম বুখারী শত শত হাজার হাদিস থেকে অত্যন্ত কঠোর নিয়ম ও বিশুদ্ধতার মানদণ্ড অনুসরণ করে শুধুমাত্র সহীহ হাদিসসমূহ সংকলন করেছিলেন।
ইমাম বুখারী ১৯৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২৫৬ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তিনি হাদিস সংকলনের জন্য প্রায় ১৬ বছর ধরে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন এবং প্রায় ৬ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করেন। তার সংকলন পদ্ধতি এতটাই নির্ভুল ছিল যে, তিনি কোনো হাদিস লিপিবদ্ধ করার আগে গোসল করে দুই রাকাত নামাজ পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করতেন। ফলে মুসলিম উম্মাহর কাছে সহীহ বুখারীকে হাদিস শাস্ত্রের সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আজও সহীহ বুখারী বিশ্বের প্রতিটি মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের কাছে অপরিহার্য গ্রন্থ। এর ব্যাখ্যাগ্রন্থসমূহ (যেমন ফতহুল বারী) ইসলামী জ্ঞানের অন্যতম সম্পদ। এই গ্রন্থ থেকে পাওয়া হাদিসসমূহ আকীদা, ইবাদত, আচার-আচরণ, নৈতিকতা ও সমাজব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। মুসলিমদের কাছে কুরআনের পর সহীহ বুখারীই সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সম্মানিত উৎস হিসেবে স্বীকৃত।
হাদিস নং ১০০
আরবি: حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ أَبِي أُوَيْسٍ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ اللَّهَ لاَ يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا، يَنْتَزِعُهُ مِنَ الْعِبَادِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا، اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالاً فَسُئِلُوا، فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا ".
বাংলা অনুবাদ: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি: “আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম ছিনিয়ে নিয়ে উঠিয়ে নেবেন না। বরং তিনি ইলম উঠিয়ে নেবেন আলিমদের মৃত্যুর মাধ্যমে। যখন কোনো আলিম থাকবে না, তখন মানুষ মূর্খদেরকে নেতা বানাবে। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তারা অজ্ঞতার সাথে ফতোয়া দিবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০০)
হাদিস নং - ১০১
আরবি: حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ الأَصْبَهَانِيِّ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا صَالِحٍ، ذَكْوَانَ يُحَدِّثُ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَتِ النِّسَاءُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ، فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِنْ نَفْسِكَ. فَوَعَدَهُنَّ يَوْمًا لَقِيَهُنَّ فِيهِ، فَوَعَظَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ، فَكَانَ فِيمَا قَالَ لَهُنَّ " مَا مِنْكُنَّ امْرَأَةٌ تُقَدِّمُ ثَلاَثَةً مِنْ وَلَدِهَا إِلاَّ كَانَ لَهَا حِجَابًا مِنَ النَّارِ ". فَقَالَتِ امْرَأَةٌ وَاثْنَيْنِ فَقَالَ " وَاثْنَيْنِ ".
বাংলা অনুবাদ: আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। কিছু মহিলা নবী (ﷺ)-কে বললেন, পুরুষরা আমাদের উপর আপনাকে দখল করে রেখেছে। অতএব আপনি আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে দিন। তিনি তাদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করে দিলেন। সেদিন তিনি তাদের উপদেশ দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন। তিনি তাদের বললেন: “তোমাদের মধ্যে যে মহিলা তার তিন সন্তানকে (মৃত্যুর পর) আগে পাঠাবে, তার জন্য তারা জাহান্নাম থেকে পর্দা হয়ে যাবে।” এক মহিলা বললেন, দু’জন হলে? তিনি বললেন, “দু’জন হলেও।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০১)
হাদিস নং - ১০২
আরবি: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ حَدَّثَنَا غُنْدَرٌ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الأَصْبَهَانِيِّ، عَنْ ذَكْوَانَ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بِهَذَا. وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الأَصْبَهَانِيِّ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا حَازِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ " ثَلاَثَةً لَمْ يَبْلُغُوا الْحِنْثَ ".
বাংলা অনুবাদ: আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে উপরোক্ত হাদিসের অনুরূপ বর্ণিত। আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, “তিন সন্তান যারা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা গেছে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০২)
হাদিস নং - ১০৩
আরবি: حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِي مَرْيَمَ، قَالَ أَخْبَرَنَا نَافِعُ بْنُ عُمَرَ، قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ أَبِي مُلَيْكَةَ، أَنَّ عَائِشَةَ، زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم كَانَتْ لاَ تَسْمَعُ شَيْئًا لاَ تَعْرِفُهُ إِلاَّ رَاجَعَتْ فِيهِ حَتَّى تَعْرِفَهُ، وَأَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَنْ حُوسِبَ عُذِّبَ ". قَالَتْ عَائِشَةُ فَقُلْتُ أَوَ لَيْسَ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى {فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا} قَالَتْ فَقَالَ " إِنَّمَا ذَلِكَ الْعَرْضُ، وَلَكِنْ مَنْ نُوقِشَ الْحِسَابَ يَهْلِكْ ".
বাংলা অনুবাদ: আয়েশা (রা.) যা শুনতেন এবং না বুঝতেন, তা বারবার জিজ্ঞাসা করে পুরোপুরি বুঝে নিতেন। নবী (ﷺ) বলেছেন: “যাকে হিসাব করা হবে, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।” আয়েশা (রা.) বললেন, আল্লাহ কি বলেননি: “তাকে সহজ হিসাব নেওয়া হবে”? নবী (ﷺ) বললেন: “সেটা শুধু উপস্থাপন। কিন্তু যার হিসাব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০৩)
হাদিস নং ১০৪
আরবি: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ حَدَّثَنِي اللَّيْثُ، قَالَ حَدَّثَنِي سَعِيدٌ، عَنْ أَبِي شُرَيْحٍ، أَنَّهُ قَالَ لِعَمْرِو بْنِ سَعِيدٍ... (পূর্ণ আরবি সংক্ষেপে) ... وَلْيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الْغَائِبَ ".
বাংলা অনুবাদ: আবূ শুরাইহ (রা.) আমর ইবনে সাঈদকে বললেন... মক্কার হুরমত (পবিত্রতা) সম্পর্কে নবী (ﷺ)-এর বাণী উল্লেখ করে শেষে বললেন: “উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে পৌঁছে দেয়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০৪ – মক্কার নিরাপত্তা ও জ্ঞান প্রচারের গুরুত্ব)
হাদিস নং ১০৫
আরবি: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الْوَهَّابِ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ مُحَمَّدٍ، عَنِ ابْنِ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِي بَكْرَةَ... فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ... أَلاَ لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ مِنْكُمُ الْغَائِبَ ".
বাংলা অনুবাদ: আবূ বাকরা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন: “নিশ্চয় তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের ইজ্জত (সম্মান) তোমাদের একে অপরের উপর হারাম, যেমন এই দিনের এই মাসের পবিত্রতা। উপস্থিত ব্যক্তি যেন অনুপস্থিত ব্যক্তিকে পৌঁছে দেয়।” তিনি দু’বার বললেন: “আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?” (সহীহ বুখারী, হাদিস ১০৫ – বিদায় হজ্জের খুতবার অংশ)
উল্লেখ্য: এগুলো সহীহ বুখারীর স্ট্যান্ডার্ড নম্বরিং অনুসারে (USC-MSA numbering)। আরবি মূল টেক্সট সুন্নাহ ডট কম থেকে নেওয়া। বাংলা অনুবাদ সাধারণত গৃহীত তাওহীদ পাবলিকেশন বা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অনুরূপ।
সহীহ বুখারী শুধু একটি হাদিস গ্রন্থ নয়, বরং ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারের এক অমূল্য সম্পদ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহের সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্য উৎস। ইমাম বুখারী (রহ.)-এর অসাধারণ পরিশ্রম, আল্লাহভীতি ও বিশুদ্ধতার প্রতি অটল দৃঢ়তার ফসল এই গ্রন্থটি আজও চৌদ্দশত বছর পরেও মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথ দেখিয়ে চলেছে। কুরআনুল কারীমের পরেই এটি ইসলামী শরীয়াহ, আকীদা, আচার-ব্যবহার ও জীবনব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
আধুনিক যুগেও সহীহ বুখারীর শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ, নৈতিক উন্নয়ন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করে। যারা এই গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন, তাদের অন্তরে ঈমানের আলো আরও উজ্জ্বল হয়। পরিশেষে বলা যায়, সহীহ বুখারী কেবল অতীতের ঐতিহ্য নয়, বরং প্রতিটি যুগের মুসলিমের জন্য এক জীবন্ত দিকনির্দেশনা এবং আল্লাহর রহমতের এক অনন্য নিদর্শন।
আল্লাহ আমাদের সকলকে এর শিক্ষা অনুসরণ করে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
