তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১৫
মাঝরাত চারদিকে ঝিঝি পোকার ডাক ছাড়া কিছুই শুনা যাচ্ছে না, নির্জন এই জায়গা যেন এই মাঝরাতে আরো নির্জন হয়ে পড়েছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখছি আর আদিল আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে নাক ঘষছে, এই সময়টায় ওর এসব দুষ্টুমি জাস্ট অসহ্য লাগছে। আদিল একহাত দিয়ে আমার পেটে হাত বুলাচ্ছে আর দুষ্টুমি করছে এবার আর শান্ত হয়ে থাকতে পারলাম না।
আমি: আদিল ভালো লাগছে না এসব।
আদিল: তোমার মন ভালো করার জন্যই তো দুষ্টুমি করছি।
আমি: প্রয়োজন নেই আমাকে ছাড়ো।
আদিল: সরি মেডাম সম্ভব না। (আদিল আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে দেখে ওর দুহাত ছাড়াতে চাইলাম)
আদিল: অজতা চেষ্টা করো না আমি না ছাড়লে তুমি ছাড়াতে পারবে না।
আমি: কতোবার বলবো আমার এসব ভালো লাগছে না।
আদিল: কেন অজতা দুশ্চিন্তা করছ বললাম তো আমি আম্মুকে বুঝাবো। (আদিল আমাকে ঘুরিয়ে দিয়ে আমার দুগাল ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে)
আমি: আমার খুব ভয় হচ্ছে।
আদিল: ভয় পেয়ো না লক্ষীটি আমি বেশি কিছু করবো না শুধু ওই মিষ্টি ঠোঁট দুটু একটু চুষবো। (আমি কিছু বলতে যাবো তখনি আদিল আমার দুগাল চেপে ধরে আমার ঠোঁটে ওর ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো, চেষ্টা করেও ওকে ছাড়াতে পারলাম না। অনেকক্ষণ পর আদিল নিজেই ছেড়ে দিলো, ধাক্কা দিয়ে ওকে দূরে সরিয়ে দিলাম। এখনো ও দুষ্টু হাসি হাসছে)
আমি: একদম হাসবে না, আমি বলেছি মা'কে ভয় পাচ্ছি আর তুমি...
আদিল: ভয় দূর করে দিলাম।
আমি: আবার হাসছ? আদিল একটু সিরিয়াস হও প্লিজ!
আদিল: ওকে হলাম সিরিয়াস, অনেক রাত হয়েছে চলো ঘুমাবে নাহলে তোমার শরীর খারাপ করবে।
আমি: এই তোমার সিরিয়াস হওয়া?
আদিল: হ্যাঁ, আমার বউ রাত জেগে অসুস্থ হবে সেটা তো আমি হতে দিতে পারিনা।
আমি: আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও নাহলে এখন...
আদিল: নাহলে কি? (আদিল আমাকে কোলে তুলে নিলো, বুঝতে পারছি না টেনশনে কি ওর মাথা পুরুটাই গেছে?)
আমি: কি করছ?
আদিল মুচকি হেসে আমাকে নিয়ে রুমের দিকে এগুলো।
আমাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিলো তারপর বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। আদিল চুপচাপ শুয়ে উপরের সিলিং ফ্যানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আমি: কি হয়েছে? (আদিলের বুকে তুথুনি রেখে ওর দিকে তাকালাম, ও আমাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো)
আদিল: কিছু নাতো।
আমি: আমি জানি তুমিও ভয় পাচ্ছ।
আদিল: হ্যাঁ পাচ্ছি, এতোক্ষণ তোমার মন ভালো করার জন্য দুষ্টুমি করেছি কারণ তোমার মায়াবী মুখটা মলিন থাকলে আমার কিছু ভালো লাগেনা অসহ্য লাগে সবকিছু।
আমি: যখন আমি থাকবো না?
আদিল: এই দিনটা যেন কখনো না আসে।
আমি: এই কয়দিনে অন্তত এইটুকু বুঝতে পেরেছি মা খুব জেদি যা বলেন তাই করেন, উনার এই জিদটাকেই আমি ভয় পাচ্ছি।
আদিল: ভয় পেয়ো না সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি: হুম।
আদিল চুপ হয়ে আছে দেখে ওর বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। খুব ভয় হচ্ছে মনে হচ্ছে এই বুকে আজই বুঝি শেষ ঘুমানো।
কলিংবেল এর শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো, মনে তো হচ্ছে এখনো ভোরবেলা। কয়টা বাজে দেখার জন্য ফোন হাতে নিলাম, মায়ের অনেক গুলো মিসড কল দেখে বেশ অবাক হলাম। ভোররাতে মা এতো ফোন দিয়েছেন কেন আর এই ভোরবেলা বাসায় কে আসলো? আবারো কলিংবেল বেজে উঠলো, আদিলকে ডাকবো কিনা ভেবে আমিই উঠে দরজা খুলতে গেলাম।
দরজা খুলে মা'কে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, এতো সকালে মা হসপিটাল থেকে চলে এসেছেন কেন?
আমি: মা কি হয়েছে?
মা: (নিশ্চুপ)
আমি: আপনি ফোন করেছিলেন ফোনটা সাইলেন্ট ছিল তাই বুঝতে পারিনি, এতো সকালে বাসায় আসলেন যে ভাইয়া ঠিক আছে তো? (মা আমার দিকে তাকালেন উনাকে দেখতে কেমন যেন লাগছে, কিছু বলতে যাবো তখনি উনি বাসার ভিতর ঢুকে পড়লেন। কিছু বুঝতে না পেরে দরজা লাগাতে গেলাম তখনি বাইরে চোখ পড়লো বাসার সামনে এম্বুলেন্স কেন? এম্বুলেন্স থেকে দুজন মানুষ একটা কফিন বের করেছে, কফিন নিয়ে তো ওরা বাসার দিকেই এগুচ্ছে। দৌড়ে মায়ের কাছে আসলাম, মা চুপচাপ সোফায় বসে আছেন)
আমি: মা ওরা লাশের কফিন বাসায় আনছে কেন কে মারা গেছে?
মা: (নিশ্চুপ)
আমি: কি হলো আপনি কথা বলছেন না কেন? (মা'কে ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম সাথে সাথে মা ঢুকরে কেঁদে উঠলেন)
মা: আমার আবির... (মা কাঁদছেন, আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না ভাইয়া যে মারা গেছেন। ফ্লোরে বসে পড়লাম, ওরা কফিন এনে ড্রয়িংরুমে রাখলো)
আদিল: আনিশা কি হয়েছে এভাবে চিৎকার... (আদিল কফিনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, আমার চিৎকারে সবাই ড্রয়িংরুমে চলে এসেছে, সবার নজর কফিনের দিকে)
নীরব: আম্মু তুমি এতো সকালে আর এই কফিন...
আদিল: আম্মু কি হয়েছে?
দাদু: কি হয়েছেরে শিরিন? এই লাশের কফিন আমার বাসায় কেন?
মা: এতে লাশ আছে তাই।
দাদু: মানে?
আদিল: ভাইয়া.. (আদিলের চিৎকার শুনে পাশ ফিরে তাকালাম, ও ভাইয়ার লাশ জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদছে)
নীরব: আম্মু কি করে হলো এসব?
মা: তোদের সবাইকে আমি ফোন করেছি তোরা কেউ আমার ফোন রিসিভ করিসনি।
নীরব: রাতের বেলা ঘুমিয়ে ছিলাম তাই বলতে পারিনি।
মা: হ্যাঁ ঘুমা তোরা, আমার আবির তো একেবারে ঘুমিয়ে পড়েছে।
মা আঁচল দিয়ে মুখ চেপে কাঁদছেন, মিতু আর আদিল কফিন জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। নীরব দাদুকে সামলাচ্ছে, বাসায় যেন কান্নার এক রুল পড়েছে আমি নির্বাক হয়ে শুধু দেখছি। ভালোবাসার মানুষ দুটু মারা গেল একজন ছয়মাস আগে আর একজন ছয়মাস পর। আচ্ছা কাল অব্ধি তো ভাইয়া ভালো ছিল তাহলে ভাইয়া মারা গেল কিভাবে?
যতো সময় যাচ্ছে ততো যেন কান্নার শব্দ বাড়ছে, আদিলদের আত্মীয়স্বজন সবাই আসতে শুরু করেছে। আমি মিতুর রুমের এক কোণায় বসে আছি, মিতু বিছানায় শুয়ে কাঁদছে। আবির ভাইয়াকে দেখতে কেন যেন আমার খুব ভয় করছে, কই রাইমার লাশ দেখার সময় তো আমার এতো ভয় করেনি। রাইমার কথা ভাবতেই হঠাৎ আব্বুর কথা মনে পড়লো আব্বুকে তো বলা প্রয়োজন, এই সময় আব্বু না আসলে আর কখন আসবেন। রুমের দিকে এগুলাম আব্বুকে ফোন করতে হবে।
আমি: আব্বু?
আব্বু: কিরে কাঁদছিস কেন?
আমি: আব্বু আদিলের বড় ভাইয়া মারা গেছেন।
আব্বু: বড় ভাই? কিন্তু বিয়ের সময় তো কেউ বলেনি আদিলের যে ভাই আছে।
আমি: আসলে উনি অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ছিলেন তাই হয়তো কেউ বলেনি, আব্বু তুমি আসো আমি তোমাকে পরে সব বলবো।
আব্বু: ঠিক আছে আমি আসছি তুই কাঁদিস না আদিলকে সামলা।
আমি: তাড়াতাড়ি এসো জানাজা বিকেলে।
আব্বু: আচ্ছা।
ফোন রেখে বিছানায় বসলাম রাইমার কথা খুব মনে পড়ছে। ছয় মাস আগে তো রাইমার লাশও এভাবে কফিনে করে হসপিটাল থেকে আনা হয়েছিল। আচ্ছা যারা সত্যিকারের ভালোবাসে তারা কি এভাবেই অকালে মারা যায়? ছয়মাস আগে যদি দুজনের বিয়ে হতো তাহলে হয়তো দুজনকে অকালে মরতে হতো না, আজ হয়তো দুজন সুখে সংসার করতো। আচ্ছা আদিলকে তো আমি সত্যি ভালোবাসি আমাদের ভালোবাসার কি পরিণতি হবে? দরজা খুলার শব্দ শুনে সামনে তাকালাম আদিল রুমে এসেছে। আদিল বিছানায় এসে বসতেই ওর হাতের উপর আমার হাত রাখলাম, ও আমার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। কি করবো বুঝতে পারছি না আদিলকে শান্তনা দিব কিভাবে আমিতো জানি ভাই বোন হারানোর যন্ত্রণা কেমন, আমার বোনও যে এভাবে মারা গিয়েছিল।
আদিল: আনিশা আমার ভাই মারা গেছে আমি একা হয়ে গেছি। (আদিল আমার কোলে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আমি ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি)
আদিল: আমি বড্ড একা হয়ে গেছি।
আমি: কে বলেছে তুমি একা নীরব আছেতো, নীরব তো তোমার আরেক ভাই। তাছাড়া মিতু আছে মা আছেন দাদু আছেন।
আদিল: হ্যাঁ সব আছে তবুও তো আপন ভাই নেই। আব্বু আম্মুর মৃত্যর পর ভাইয়াকেই আমি মা বাবা মেনেছি, ভাইয়া আমাকে মায়ের ভালোবাসা প্রয়োজন হলে মায়ের মতো ভালোবেসেছে বাবার ভালোবাসা প্রয়োজন হলে বাবার মতো ভালোবেসেছে, প্রয়োজনে আব্বু আম্মুর মতো শাসনও করেছে। এখন কে আমায় এতো ভালোবাসবে আর শাসন করবে?
আমি: আব্বু আম্মুর মৃত্যুর পর মানে? তুমি সেদিন মাতাল অবস্থায় বলেছিলে উনি তোমার আপন মা নয়, তাহলে উনি কে আর তোমার আব্বু আম্মু... আদিল আদিল... (আদিল তো সেন্সলেস হয়ে পড়েছে এখন কি করি। আদিলকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে পানি আনলাম। আদিলের চোখেমুখে পানির ছিটা দিতেই ও আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকালো)
আমি: একদম নড়বে না চুপ হয়ে শুয়ে থাকো এখানে।
আদিল: কাঁদছ কেন আমার কিছু হয়নি।
আমি: হ্যাঁ কিছু যে হয়নি তাতো দেখতেই পারছি।
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: আচ্ছা তুমি এভাবে কেঁদে অসুস্থ হয়ে পড়লে মিতুর কি হবে একবারো ভেবেছ মিতুর কথা? আদিল প্লিজ বুঝার চেষ্টা করো তুমি এখন সবার ভরসা তুমি ভেঙ্গে পড়লে হবেনা।
আদিল: আমার ভরসা যে তুমি, আমার তো ভয় হচ্ছে আম্মু যদি তোমাকে...
আমি: কেঁদো না যা হবার তাতো হবেই।
আদিল: (নিশ্চুপ)
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, একটু পর ভাইয়ার দাফনকাজ হবে কিন্তু আব্বু তো এখনো আসলেন না। আব্বুর কথা ভাবতে ভাবতে দরজার দিকে তাকাতেই দেখি আব্বু ভিতরে আসছেন।
আব্বু: আনিশা...
আমি: আব্বু আমার সাথে এসো।
আব্বু: আরে এতো তাড়াহুড়ো করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? সবার সাথে কথা বলতে দে।
আমি: চলো তো।
আব্বুকে টেনে আমার রুমে নিয়ে আসলাম, আমি আমার আব্বুকে ভালো করে ছিনি আজ যদি মা রাগ দেখান তাহলে আব্বুও রেগে যাবেন।
আব্বু: কি হয়েছে বলবি তো।
আমি: আব্বু আমি যা বলবো তুমি সব শুনবে বলো।
আব্বু: আগে বলবি তো, তোকে এমন চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
আমি: ভাইয়ার দাফনকাজের পর হয়তো মা আমাকে এই বাসা থেকে চলে যেতে বলবেন তুমি প্লিজ রেগে যেওনা, বুঝতে পারছ তো ওদের কারো মনের অবস্থা ঠিক নেই।
আব্বু: তোর কথা কিছুই আমি বুঝতে পারছি না স্পষ্ট করে বলতো কি হয়েছে।
আমি: আব্বু আজ যে মারা গেছে আবির ভাইয়া উনাকে রাইমা ভালোবাসতো।
আব্বু: কি?
আমি: হ্যাঁ আব্বু রাইমা এজন্যই সুইসাইড করেছিল আর আজ আবির ভাইয়া মারা গেল, ভাইয়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এতোদিন হসপিটালে ছিল।
আব্বু: তুই জানলি কিভাবে?
আমি: তোমাকে পরে সব বলবো তুমি শুধু আজকে রেগে যেওনা মা যা বলেন তাই মেনে নিও।
আব্বু: কিন্তু এতে তোর সম্পর্ক কি তোকে কেন বাসা থেকে তাড়িয়ে দিবে?
আমি: কারণ মা চান না রাইমার বোন এ বাসার বউ হয়ে থাকুক।
আব্বু: এ কেমন কথা? উনি তোর জীবন এভাবে নষ্ট করতে পারেন না।
আমি: পরে নাহয় মা'কে বুঝাবো, আজ অন্তত তুমি রাগারাগি করো না।
আব্বু: আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবো এটাই তো বলতে চাইছিস তুই? দেখ আনিশা রাইমার ব্যাপারে আমি জানতাম না তাই এমন হয়েছে কিন্তু তোর বেলায় আমি এমন হতে দেই কি করে? আমি যতোটুকু বুঝতে পেরেছি তুই আদিলকে ভালোবাসিস।
আমি: হ্যাঁ ভালোবাসি, কিন্তু আব্বু মা যা বলেন তাই তো মানতে হবে।
আব্বু: আমি মানতে পারবো না, আমার কাছে আমার মেয়ে আগে।
আমি: আব্বু...
আব্বু: আসছি আমি।
ধ্যাত আব্বু তো রেগে চলে গেলেন, আজ কি হবে আল্লাহ্ জানেন।
ভাইয়ার লাশ বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মা'তো পাগলের মতো কাঁদছেন। মায়ের কাছে এসে উনাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলাম কিন্তু উনি আমার দিকে রাগি চোখে তাকালেন।
আমি: মা আজ অন্তত আমার উপর রেগে থাকবেন না প্লিজ!
মা: আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও।
মিতু: ভাবি এই মহিলা পাগল হয়ে গেছে চলে আস ওর সামনে থেকে, ছেলে মারা গেছে অথচ উনার রাগ কমেনি।
মিতু আমাকে টেনে মায়ের রুম থেকে নিয়ে আসলো। খুব কষ্ট হচ্ছে উনি এমন কেন আজকের দিনেও উনি আমার সাথে এমন করছেন।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে দাফনকাজ শেষে সবাই বাসায় ফিরে এসেছে। আত্মীয়স্বজনরা চলে যাচ্ছেন, আদিল নীরবের কাধে মাথা রেখে সোফায় বসে আছে, আব্বু আর দাদু সোফায় বসে কথা বলছেন, আমি মিতুকে জড়িয়ে ধরে ফ্লোরে বসে আছি। হঠাৎ মা এসে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন, মাথায় ঘোমটা দেওয়া হয়তো আব্বু আছেন এখানে তাই।
মা: আদিল আমি তোকে একটা কথা বলতে চাই।
আদিল: তার আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।
মা: কি?
আদিল: ভাইয়া কিভাবে মারা গেছে আর ভাইয়ার গলায় দাগ কিসের ছিল?
মা: আবির সুইসাইড করেছে গলায় ফাঁসি দিয়ে।
আদিল: কি?
দাদু: কি বলছিস এসব?
নীরব: সুইসাইড? তাহলে তুমি ভাইয়াকে নিয়ে এতো তাড়াতাড়ি বাসায় আসলে কিভাবে পুলিশ...
মা: তোদের ফোন করে যখন পাইনি আমি সব সামলে নিয়েছি।
নীরব: এতোদিন ভাইয়া কিছু করেনি আজ হঠাৎ...
মা: গতকাল ডক্টর বলেছিল আবিরকে আনিশা সুস্থ করে তুলতে পারবে ওকে যেন বাসায় নিয়ে আসি। আমি প্রথমে আপত্তি করলেও আবিরের সুস্থতার কথা ভেবে রাজি হয়ে যাই কিন্তু আবির বেশি পাগলামি শুরু করে। আবির বারবার বলছিল ও আনিশাকে সহ্য করতে পারবে না আর আদিলের স্ত্রী হিসেবে তো না'ই। রাতে পাগলামি করলেও মাঝরাতে আবির ঘুমিয়ে পড়েছিল কিন্তু শেষ রাতে আবির... (মা কাঁদছেন, আমি মায়ের দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি এবার কি মা ভাইয়ার মৃত্যুর জন্য আমাকে দায়ী করবেন?)
মা: রাইমাকে ভালোবেসে আবির পাগল হয়েছিল আর আজ আনিশাকে আদিলের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারবে না বলে আবির সুইসাইড করেছে, আমি চাই না আনিশা আর আদিলের স্ত্রী হিসেবে এই বাসায় থাকুক।
দাদু: শিরিন এবার কিন্তু তুই বাড়াবাড়ি করছিস, আবির মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল ও তো যা খুশি তাই বলবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু তুই তো সুস্থ আছিস তাহলে তুই কেন পাগলামি করছিস? আবিরের বলা কথাগুলো ধরে নিয়ে আদিল আর আনিশাকে আলাদা করে দেওয়া তোর সবচেয়ে বড় বোকামি হবে।
আব্বু: আমি নীরবে সব সহ্য করছি বলে ভাববেন না আমি...
মা: নীরবে সহ্য করতে তো কেউ বলেনি। (মা ঘোমটা সরিয়ে ফেলেছেন দেখে সবাই অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি, মা তো কারো সামনে আসেন না তাহলে আব্বুর সামনে ঘোমটা সরিয়ে ফেললেন কেন? আব্বুর দিকে তাকালাম মা'কে দেখে আব্বু কেমন যেন চমকে উঠলেন)
মা: আমি যখন বলেছি আনিশা এ বাসায় থাকবে না তাহলে থাকবেই না। আমি এক মাসের মধ্যে ডিভোর্স এর ব্যবস্থা করে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবো, আপনি এবার আনিশাকে নিয়ে আসতে পারেন।
নীরব: আম্মু কি বলছ এই রাতের বেলা ওরা কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাবে?
মা: সেটা ওদের ব্যাপার।
দাদু: শিরিন তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস।
মা: বাড়াবাড়ি মনে হলে বাড়াবাড়িই। (মা রুমে চলে গেলেন, আমি আদিলের দিকে তাকিয়ে আছি ও কিছু বলছে না কেন?)
আমি: আদিল তুমি কিছু বলবে না?
আদিল: (নিশ্চুপ)
আব্বু: মা যেমন ছেলে তো তেমনই হবে, আনিশা চল।
আমি: আব্বু...
আব্বু: এ বাসায় আমি তোকে রাখবো না, চল বলছি।
আব্বু আমার হাত ধরে টেনে বাসা থেকে বেরিয়ে আসছেন, আমি পিছন ফিরে আদিলের দিকে তাকিয়ে আছি আর কাঁদছি। আদিল বোবার মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে ওর দুচোখে পানির ছিটেফোঁটাও নেই...
চলবে😍
