তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১৪
আবির ভাইয়া রাইমা রাইমা বলে জোড়ে জোড়ে চিৎকার করছে আর নিজের শরীরে আঘাত করছে, ভাইয়ার চিৎকারে হসপিটালের অনেক মানুষ এসে এখানে জড়ো হয়েছে। মা ভাইয়াকে সামলাতে পারছে না বলে আদিল এগিয়ে গেল। ভাইয়ার অবস্থা দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে একটা মানুষ ভালোবাসার জন্য এতোটা কষ্ট পাচ্ছে, আমিই বা কি করবো আমিতো আর রাইমাকে ভাইয়ার কাছে এনে দিতে পারবো না, রাইমা তো সবাইকে ছেড়ে ছয়মাস আগেই চলে গেছে।
আমি: আদিল? (আমি ভাইয়ার কাছে এসেছি দেখে আদিল সরে গেল, আমাকে দেখে ভাইয়া শান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে)
আমি: কেন পাগলামি করছেন? আপনার মা কষ্ট পাচ্ছেন দেখছেন না?
ভাইয়া: আমার রাইমা সত্যি মারা গেছে?
আমি: সত্যিটা লুকিয়ে তো লাভ নেই কারণ আমি চাইলেও রাইমাকে আপনার কাছে এনে দিতে পারবো না, হ্যাঁ রাইমা সত্যি মারা গেছে। বিয়ের দিন ও বিষ খেয়েছিল, আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম বাঁচানোর কিন্তু যার বাঁচার ইচ্ছে নেই তাকে কি জোড় করে বাঁচিয়ে রাখা যায়? রাইমা সুইসাইড নোটে লিখেছিল ওর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় কারণ নিয়তি ওর সাথে বেঈমানি করেছে। আমি সেদিন ভেবেছিলাম ও কথা বলতে পারেনা এটাই বুঝি ওর দুঃখ কিন্তু আজ ওর শেষ কথাটার মানে বুঝলাম, আসলে ও আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে চায়নি।
ভাইয়া: আমি না আমার রাইমাকে খুব ভালোবাসি, ওকে কখনো বোবা বলিনি আমি ওর চোখের দিকে তাকালেই ও কি বলতে চায় সেটা বুঝে ফেলতাম।
আমি: তাহলে আমাদের জানাননি কেন আপনাদের ভালোবাসার কথা? (আমার প্রশ্ন শুনে ভাইয়া মায়ের দিকে তাকালো তারপর হঠাৎ হাসতে শুরু করলো)
ভাইয়া: রাইমা অন্য কাউকে বিয়ে করেনি ও আমারই হবে আর আজকেই হবে।
মা: আবির এসব কি বলছিস? রাইমা মারা গেছে ও কি করে তোর হবে?
ভাইয়া: আমিও মরে রাইমার কাছে চলে যাবো।
মা: আবির?
আমি: এসব বলতে নেই ভাইয়া, আপনি সুস্থ হন তা...
ভাইয়া: তোমাকে দেখলে আমার কষ্ট হচ্ছে, মাথা যন্ত্রণা করছে, সব স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে তুমি চলে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। (ভাইয়া আমাকে ধাক্কা দিতেই আদিল এসে ধরে ফেললো)
মা: আদিল নিয়ে যা এই মেয়েকে আমার আবিরের কষ্ট হচ্ছে।
আদিল: তোমরা দুজন যমজ বোন তো তাই তোমাকে দেখে ভাইয়ার সবকিছু মনে পড়ছে, তোমার এখানে না থাকাই ভালো।
আদিল আমাকে টেনে নিয়ে আসলো, পিছন ফিরে আবার তাকালাম ভাইয়া চিৎকার করে কাঁদছে আর নিজের চুল ধরে টানছে। দুজন নার্স জোড় করে ভাইয়াকে বিছানায় শুয়ে দিতেই ডক্টর ভাইয়ার হাতে ইনজেকশন পুষ করলো, ভাইয়া আস্তে আস্তে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
আদিল: আনিশা এবার বুঝেছ তো আমি মাঝেমাঝে কেন নেশা করি? (গাড়িতে বসে একটু আগে ঘটে যাওয়া সবকিছু মনে করছিলাম আর চোখের পানি মুছছিলাম আদিলের কথা শুনে ওর দিকে তাকালাম, আদিল কাঁদছে আর বারবার চোখের পানি মুছছে)
আদিল: ভাইয়াকে যেদিন দেখতে আসি সেদিনই আমি নেশা করে বাসায় ফিরি, এখানে এসে ভাইয়ার এই অবস্থা দেখে বুকের ভিতরে লুকানো কষ্ট গুলোকে আর দমিয়ে রাখতে পারিনা। সেদিন ভাইয়ার এই অবস্থা দেখার পর বারবার মনে হচ্ছিল যে মেয়ের জন্য ভাইয়ার এই অবস্থা সে মেয়েকেই আমি ভালোবাসি, সে মেয়েই আমার স্ত্রী আর এই মেয়ের সাথেই আমি এক রুমে থাকি। এসব ভাবনা আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিল তাই সেদিন এতো নেশা করেছিলাম আর তোমার উপর অত্যাচার করেছিলাম। নিজের ভাইকে এমন অবস্থায় দেখতে কতোটা কষ্ট হয় তুমি বুঝবে না।
আমি: নিজের বোনকে সাদা কাঁপনে মোড়ানো অবস্থায় দেখলে কতোটা কষ্ট হয় তুমি বুঝো? (আদিল আমার দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে কাঁদছে)
আমি: আমাদের দুজনকে জন্ম দিতে গিয়ে আম্মুর মৃত্যু হয়, আব্বু আর ফুফু আমাদের দুবোনকে আগলে রেখে বড় করেছেন। যমজ হলেও আমরা দুজন দু রকমের ছিলাম, আমি ছোটবেলা থেকেই খুব দুষ্টু ছিলাম আর রাইমা ছিল চাপা স্বভাবের। আমার যা পছন্দ হতো তা আমি জোড় করে হলেও নিতাম আর রাইমা চুপচাপ মেনে নিতো কখনো মুখ ফুটে কিছু বলতো না, যেমন করে বলেনি ওর ভালোবাসার কথা।
আদিল: তোমাকে কখনো বলেনি ও কাউকে ভালোবাসে?
আমি: না, আমি বোকার মতো কখনো জানতেও চাইনি। আসলে আমি রাইমাকে সময় দিতাম না, ওর পছন্দ ছিল বাসায় চার দেয়ালের মধ্যে থাকা আর আমার পছন্দ ছিল বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। আমি সারাদিন ঘুরে এসে সবকিছুর গল্প বলতাম ওকে আর ও মুগ্ধ হয়ে শুনতো। আমি ওর সাথে ঝগড়া করতাম কিন্তু ও ঝগড়া করতো না, ওর মধ্যে কেমন যেন একটা বড় বোনের ভাব ছিল। আমি কোনো ভুল করলে আব্বুকে মিথ্যে বলে আমাকে বকা শুনানোর থেকে বাঁচিয়ে দিতো।
আদিল: ও না কথা বলতে পারতো না?
আমি: সেটা তো তিন বছর আগে থেকে। তিন বছর আগে, সেদিন আমার খুব জ্বর ছিল তাই কলেজ যাইনি রাইমা একাই গিয়েছিল আর কলেজ থেকে ফেরার পথে ওর এক্সিডেন্ট হয়েছিল। এক্সিডেন্টে ওর কন্ঠনালীতে আঘাত লাগে, কতো হসপিটাল কতো বড় বড় ডক্টর দেখিয়েছি কোনো লাভ হয়নি। সেদিন থেকে রাইমা কথা বলতে পারেনা, এক্সিডেন্টের পর ও আরো চুপচাপ হয়ে যায়, এতোটাই চুপচাপ যে নিজের ভিতরের কষ্টটা আমাকে পর্যন্ত বলেনি।
আদিল: কেঁদো না প্লিজ!
আমি: জানো আদিল ওর যেদিন বিয়ে ছিল সেদিন আমি নিজের হাতে ওকে বউ সাজিয়েছিলাম, সাজানোর ফাঁকে বারবার চোখের পানিতে ওর কাজল লেপ্টে যাচ্ছিল আমি সেদিন বুঝিনি আমার বোনের চোখের জল ভালোবাসার মানুষের জন্য ছিল আমিতো বোকার মতো ভেবেছিলাম আমাদের ছেড়ে শশুড় বাড়ি চলে যাবে বলে কাঁদছে।
আদিল: বিয়ে ঠিক করার আগে তোমরা জিজ্ঞেস করনি ও রাজি কিনা?
আমি: হ্যাঁ জিজ্ঞেস করেছি তো আমি ছেলের ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম পছন্দ হয়েছে কিনা রাইমা হাসি মুখে ইশারায় বুঝিয়েছিল পছন্দ হয়েছে। আব্বু বিয়ের প্রস্তাব আসার সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করেছিলেন ওর কাউকে পছন্দ আছে কিনা কিন্তু ও সেদিন ইশারায় না বলেছিল।
আদিল: ভাইয়াকে ভালোবাসা সত্ত্বেও পছন্দ নেই বলে মিথ্যে বললো কেন?
আমি: এই প্রশ্নের উত্তর তো রাইমা দিতে পারতো, হয়তো ভাইয়াও দিতে পারবে।
আদিল: যে মানসিক ভারসাম্যহীন তার থেকে উত্তর পাওয়ার আশা করোনা। আমি ভাইয়াকে রাইমার ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন করেছি ভাইয়া কোনো উত্তর দেয়নি এমনকি নামটাও কখনো বলেনি, ভাইয়াকে কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু হাসে আর ভাবনার জগতে ডুবে থাকে।
আমি: জানো আদিল বিয়ের দিন রাইমাকে খুব সুন্দর লাগছিল, আব্বু তো খুব খুশি ছিলেন এতো প্রস্তাব ফিরে যাবার পর শেষ পর্যন্ত বোবা মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে ভেবে। ছেলে পক্ষ আসার আগ মুহূর্তে আমি রুমে সাজছিলাম হঠাৎ আব্বু রাইমা বলে চিৎকার দেন, দৌড়ে গিয়ে দেখি আমার বোনের নিথর দেহটা ফ্লোরে পড়ে আছে আর ওর হাতে ছিল বিষের বোতল। আমার জীবনে আমি খুব কম কেঁদেছি দুষ্টু ছিলাম তো কষ্ট আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি কিন্তু সেদিন রাইমার নিথর দেহ দেখে চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। বেশিক্ষণ কাঁদতে পারিনি, রাইমার দাফনকাজের পর আমি স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে স্বাভাবিক আছি এইটার অভিনয় করতে হয়েছিল কারণ আমি কাঁদলে আব্বুকে দেখবে কে? সেদিন রাইমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম আর এখন কাঁদি তোমার অবহেলায়।
আদিল আমার দিকে তাকিয়ে আমার চোখের পানি মুছে দিলো তারপর বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। ভয় হচ্ছে খুব আব্বুকে কি বলবো আমি? আব্বু আমাদের দুবোনের কোনো আশা অপূর্ণ রাখেননি, আব্বু যদি শুনেন রাইমা ভালোবাসার জন্য সুইসাইড করেছে তাহলে খুব কষ্ট পাবেন।
বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম কিছু ভালো লাগছে না, কি থেকে কি হয়ে গেল মাথায় শুধু এসবই ঘুরছে। ছয়মাস আগের ঘটনা নতুন করে নতুন ভাবে সামনে এসে যেন দাঁড়াচ্ছে, কি হবে এসবের শেষ পরিণতি ভাবতেই পারছি না। রাইমা তো সুইসাইড করলো কিন্তু আবির ভাইয়া? উনাকে তো সুস্থ করে তুলতে হবে।
দাদু: আনিশা এতো মনোযোগ দিয়ে কি ভাবছিস? (দাদু আসছেন দেখে উঠে বসলাম)
আমি: সেরকম কিছু না দাদু।
দাদু: আদিল কোথায়? (দাদু সোফায় বসতে বসতে চারদিকে চোখ বুলালেন)
আমি: ওর তো মন ভালো নেই আশেপাশেই হাটতে গেছে আমিও বাধা দেইনি, ঘুরে এসে যদি মন একটু ভালো হয়।
দাদু: কি থেকে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আবির এভাবে হসপিটাল পড়ে আছে এসব দেখে কি আমাদের কারো ভালো লাগে? আদিল নিজের ভাইয়ের এই অবস্থা মেনে নিতে পারছে না।
আমি: আচ্ছা দাদু ডক্টর কি বলেছে ভাইয়া কি কখনো সুস্থ হবে না?
দাদু: কতো ডক্টর দেখালাম দেশের বাহিরে পর্যন্ত পাঠিয়েছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
আমি: আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে দাদু।
দাদু: তবে এতো কিছুর মধ্যে এইটা ভেবে ভালো লাগছে যে আমার আবির দাদু ভাইয়ের মতো আদিল দাদু ভাইকে কষ্ট পেতে হবে না। এতোদিন তো ভয়ে ছিলাম তোকে শিরিন তাড়িয়ে দিবে ভেবে কিন্তু এখন তো আর এইটা করতে পারবে না কারণ তোর তো কোনো দোষ নেই।
আমি: দোষ রাইমারও নেই দাদু কারণ ও কাউকে ঠকানোর মেয়েই ছিলনা, তবে রাইমা কেন আমাদের ভাইয়ার কথা জানায়নি সেটা ভেবে পাচ্ছি না।
দাদু: যা হবার তো হয়েই গেছে এখন আবির সুস্থ হলেই হলো আর তোকে বলছি আদিলকে কখনো কষ্ট দিস না।
মিতু: ভাবি... (মিতু দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো)
আমি: কি ব্যাপার এতো খুশি?
মিতু: আমি জানতাম তুমি কোনো অন্যায় করতেই পারো না। উফফ এবার শান্তি লাগছে আম্মুর সামনে অভিনয় করে তোমাকে আর বকাঝকা করতে হবে না। কিন্তু রাইমা আপুর কথা ভেবে খারাপও লাগছে আর ভাইয়া তো...
আমি: মন খারাপ করো না মিতু দেখো ভাইয়া ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে।
আদিল: হবে না, কতো ডক্টর দেখালাম। (আদিল এসে বিছানার এক কোণে বসলো)
আদিল: এতো এতো টাকা খরচ করেছি শুধুমাত্র ভাইয়াকে আগের মতো সুস্থ দেখার জন্য কিন্তু লাভ হলো না। ব্যাংকে যা ছিল তাতে হয়নি, ভাইয়ার নিজের হাতে গড়া ফ্ল্যাট কম্পানি সবকিছু বিক্রি করতে হয়েছে। সবকিছুর পরও যদি ভাইয়া আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতো...
মিতু: ভাইয়া কাঁদছ কেন দেখো বড় ভাইয়া ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে আর আবারো টাকা ইনকাম করবে আমাদের আবার সবকিছু হবে।
আদিল: আমার ব্যাংক ব্যালেন্স ফ্ল্যাট কম্পানি এসব চাই না যেভাবে আছি এভাবে থাকলেই হবে শুধু ভাইয়াকে স্বাভাবিক দেখতে চাই। (আদিল বিছানার কোণায় বসে কাঁদছে, দাদু আর মিতু চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেল। আজ বুঝতে পারছি ওদের সবার মনে কিসের এতো কষ্ট, একসময় ওদের সব ছিল হাসিখুশি একটা পরিবার ছিল আর আজ সবকিছু হারিয়ে ভাইয়ার এই অবস্থা দেখতে হচ্ছে)
আদিল: জানো আনিশা যতো ডক্টর দেখিয়েছি সবাই শুধু একটা কথাই বলেছে ভাইয়া সুস্থ হবে না।
আমি: যে ভালোবেসে পাগল হয় তাকে কি আর ভালোবাসা ছাড়া সুস্থ করা যায়?
আদিল: কিন্তু ভালোবাসা পাবো কোথায় রাইমা তো...
আমি: সব ঠিক হয়ে যাবে ভাইয়া সুস্থ হবে আল্লাহর উপর ভরসা রাখো।
আদিল: (নিশ্চুপ)
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে রাতের আকাশ দেখছি আর ভাবছি রাইমা যদি একবার আমাকে ওর রিলেশনের কথা বলতো তাহলে হয়তো আজকের এই দিনটা দেখতে হতো না। হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো, চমকে উঠলাম আব্বু নয়তো? ফোনের স্কিনে আব্বু লেখা ভাসছে, যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হলো। ফোন হাতে নিয়ে ভাবছি রিসিভ করবো কিনা, রিসিভ না করলে আব্বু আবার টেনশন করবে তাই রিসিভ করলাম।
আমি: আব্বু...
আব্বু: এসে ফোন করার কথা ছিল করিসনি তো, কি হয়েছে তোর বলতো আমাকে।
আমি: কি হবে কিছু হয়নি তো।
আব্বু: তোর কন্ঠটা এমন কাঁপা কাঁপা শুনাচ্ছে কেন তুই কি কাঁদছিস?
আমি: আব্বু রাইমার কথা খুব মনে পড়ছে।
আব্বু: (নিশ্চুপ)
আমি: আচ্ছা আব্বু রাইমা কি কখনো তোমাকে বলেছিল ও কাউকে ভালোবাসে?
আব্বু: আমার মেয়ে কাউকে ভালোবাসবে আর আমি ওকে তার হাতে তুলে দিবো না তা কি হয়? কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন করছিস কেন?
আমি: এমনি, আজ হঠাৎ মনে পড়ছে ওর কথা।
আব্বু: কিছু লুকাচ্ছিস আমার থেকে? দেখ ভিতরে কষ্ট চেপে রাখিস না আব্বুকে বল কি হয়েছে।
আমি: বাসায় আসবো তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে, এসে নাহয় সব বলবো।
আব্বু: ঠিক আছে।
মিতু: ভাবি খাবে না?
আমি: হ্যাঁ আসছি।
আব্বু: যা খেয়ে নে রাখছি।
আমি: ঠিক আছে।
আমি: আদিল আমি বাসায় যাবো দুদিনের জন্য? (আমার প্রশ্ন শুনে সবাই খাবার রেখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, সবাই হয়তো ভাবছে বাসার এমন পরিস্থিতিতে আমি কি করে যেতে চাইছি। কিন্তু আমি কি করবো আমার বোনও তো মারা গেছে ওর কথা যে আজ খুব মনে পড়ছে, আব্বুর কাছে গেলে হয়তো কষ্টটা কিছু কম হবে)
নীরব: এই পরিস্থিতিতে যেতে চাচ্ছ আম্মু যদি রেগে যায়?
মিতু: হ্যাঁ আম্মু রেগে যেতে পারে।
আদিল: আম্মুকে আমি সামলে নিবো ওর বাসায় যাওয়াটা প্রয়োজন। শুধু কি আমাদের মনের অবস্থার কথা ভাবলে চলবে? আনিশার মনও তো ভালো নেই, ও এতো গুলো মাস পর ওর বোনের সুইসাইড করার কারণ জানতে পেরেছে। একবার ভেবে দেখ ওর মনের উপর দিয়ে কেমন ঝড় বয়ে যাচ্ছে, ওর আব্বুর কাছে গেলে হয়তো কষ্টটা কম হবে।
মিতু: ঠিক আছে।
নীরব: তুই খাবার রেখে কোথায় চলে যাচ্ছিস?
আদিল: খেতে ইচ্ছে করছে না, ভাইয়া কি করছে জানতে হবে।
আদিল খাবার রেখে চলে গেল, এসব আর ভালো লাগছে না কবে যে সবকিছু ঠিক হবে।
রুমে এসে দেখি আদিল আমার ফোন থেকে কাকে যেন ফোন করছে।
আমি: কাকে ফোন করছ?
আদিল: আম্মুকে, কেন যে রিসিভ করছে না।
আমি: ভাইয়াকে নিয়ে ব্যস্ত হয়তো।
আদিল: এইতো রিসিভ করেছে।
আমি: স্পীকার দাওনা আমি শুনবো ভাইয়া কেমন আছে।
আদিল: হুম।
হ্যাঁ আম্মু কি করছ বাসায় আসলে না যে?
মা: আবির খুব পাগলামি করছে ওকে একা রেখে চলে আসি কিভাবে?
আদিল: আবার?
মা: হ্যাঁ, সব হয়েছে আনিশার জন্য। (মায়ের কথা শুনে বেশ অবাক হলাম)
আদিল: আম্মু ওকে দোষ দিচ্ছ কেন ও কি করেছে?
আমি: মা আমি কি করলাম আমিতো শুধু...
ভাইয়া: তোমরা না বলেছ রাইমা মারা গেছে? এইতো রাইমা কথা বলছে, তোমরা আমাকে মিথ্যে বললে?
মা: এইটা রাইমা নয় বাবা ও আনিশা।
ভাইয়া: ওকে একদম সহ্য হয় না ওকে দেখলে আমার সব মনে পড়ে যায়। (ভাইয়া জোড়ে জোড়ে চিৎকার শুরু করেছে, হয়তো নিজের শরীরে নিজে আঘাতও করছে)
মা: আনিশাকে দেখার পর থেকে আবির বেশি পাগলামি করছে, আবিরের কিছু হলে আনিশাকে আমি ছাড়বো না। এক বোনের জন্য আমার ছেলে পাগল হয়েছে অন্য বোনের জন্য যদি ওর খারাপ কিছু...
আদিল: আম্মু তুমি শুধু শুধু আনিশাকে দোষ দিচ্ছ।
মা: কে দোষী আর কে দোষী নয় এসব আমার কাছে বড় নয়, আমার কাছে সবার আগে আমার আবির। আর আবির ওকে দেখতে পারেনা যখন ও আমার বাসায় থাকতে পারবে না, ওকে বল ঢাকায় চলে যেতে।
আদিল: আম্মু কি বলছ এসব?
মা: আমি কাল বাসায় এসে যেন আনিশাকে না দেখি, যদি দেখেছি তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে। আমি ডিভোর্স এর ব্যবস্থা করবো।
মা ফোন রেখে দিলেন, আমি বিছানায় বসে পড়লাম।
আদিল আমার দিকে তাকিয়ে আছে ওর দুচোখে পানি টলমল করছে, আমি বিছানায় বসে মায়ের বলা কথা গুলো ভাবছি। মা আমাদের দুজনকে সত্যি আলাদা করে দিবেন? কিন্তু আমার কি দোষ?
আদিল: এই পাগলী কাঁদছ কেন আমি কি মরে গেছি? আমি তোমাকে আগলে রাখবো, আমরা কখনো আলাদা হবো না দেখো।।
আমি: কথা গুলো এখন বলছ কিন্তু মায়ের সামনে বলতে পারবে না, আমি জানি মা এসে যা বলবে তুমি সেটাই করবে।
আদিল: কেন সেটা করতে যাবো তুমি তো কোনো দোষ করনি।
আমি: আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।
আদিল: আমি কি বলেছি আমাকে ছাড়া থাকতে হবে? পাগলী অজতাই কাঁদছ তুমি।
আদিল আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো, ওর বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছি। আমিতো অজতা ভয় পাচ্ছিনা মা যা বলেছেন বাসায় ফিরে সেটাই করবেন। আর আব্বু তো রাইমার সুইসাইড এর কারণ জানতে পারলে আমার উপর অত্যাচার করা হচ্ছে জানতে পারলে আমাকে এখানে আর রাখবে না। ভয় হচ্ছে খুব সত্যি যদি আমাদের আলাদা করে দেয় ওরা? আচ্ছা সত্যিকারের ভালোবাসায় এতো কষ্ট কেন...
চলবে😍
