তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১৩
জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সকালের ফুরফুরে বাতাস উপভোগ করছি আর আকাশ দেখছি। আজ মনের মধ্যে কেমন যেন এক অজানা ভয় কাজ করছে, আদিল আমাকে আজ কোথায় নিয়ে যাবে কি দেখাবে? মা বাসায় ফিরে আমাকে মেনে নিবে কিনা সব ভাবনা গুলো মনে এসে হানা দিচ্ছে। আদিলের দিকে তাকালাম এখনো ঘুমাচ্ছে, ঘুম ভাঙাবো কিনা ভাবছি, যদি রেগে যায়? রাগ করবে কেন আজ তো আমাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার কথা আর বেলা অনেক হয়েছে ঘুম ভাঙানো তো প্রয়োজন। এসব ভাবতে ভাবতে আদিলের পাশে এসে বসলাম, কিভাবে ডাক দিবো ভাবতেই তোয়ালে দিয়ে পেছানো আমার ভেজা চুলের দিকে নজর পড়লো। মিষ্টি হেসে এক গুচ্ছ চুল আদিলের মুখের উপর ধরলাম, চুল থেকে পানি ওর মুখে পড়ছে আর ও বারবার চোখমুখ কুঁচকে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করছে হিহিহি।
আদিল: আনিশা ঘুমুতে দাও। (এখনো চোখ বন্ধ করে আছে উফফ)
আমি: আমাকে নিয়ে কোথায় যেন যাবে বলছিলে উঠো বলছি।
আদিল: যাবো তো বিকেলে এখন ঘুমুতে দাও।
আমি: না ঘুমুতে দিবো না।
আদিল: উফফ আনিশা... (আদিল চোখ খুলে তাকিয়ে আমার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে, ভ্রু কুঁচকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম..)
আমি: কি?
আদিল: আবার এই দৃশ্য?
আমি: কি? (আদিল আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে টেনে আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো, দুচোখ বুজে পাগলের মতো আমার গলায় ওর নাক ঘষছে)
আমি: কি হচ্ছে কি?
আদিল: তুমি জানো তোমাকে কখন বেশি সুন্দর লাগে?
আমি: উঁহু।
আদিল: ভেজা চুলে তোয়ালে পেছানো অবস্থায়।
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: সেদিন এজন্যই তোমার চুল থেকে তোয়ালে খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম।
আমি: হয়েছে এবার উঠো।
আদিল: আর একটু ঘুমাই প্লিজ রাতে তো ঘুমুতে দাওনি।
আমি: এই আমার দোষ দিচ্ছ কেন আমি ঘুমাতে নিষেধ করেছিলাম নাকি?
আদিল: এমন একটা মায়াবতী বউ পাশে থাকলে ঘুম তো নিজে থেকেই পালিয়ে যায়। (আদিল আমার চুল থেকে তোয়ালেটা খুলে নিলো সাথে সাথে আমার ভেজা চুলগুলো ওর মুখের উপর গিয়ে পড়লো, আদিল চোখ বুজে চুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে)
আমি: তুমি কিন্তু তোমার কথা রাখছ না, তুমি বলেছিলে কোথায় যেন আমাকে নিয়ে যাবে কিন্তু তুমি তো ঘুম থেকেই উঠছ না।
আদিল: যাবো তো বিকেলে।
আমি: না এখন যাবো।
আদিল: যাওয়ার জন্য পাগল হয়েছ কিন্তু যাওয়ার পর যে কি ঘটবে সেটা তো আন্দাজ করতে পারছ না।
আমি: যাই ঘটে যাক আমি যাবো।
আমি: ঠিক আছে বিকেলে যাবো, এখন গেলে আম্মুর মুখোমুখি হতে হবে।
আমি: মা কি ওখানে?
আদিল: হুম।
আমি: ঠিক আছে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও আমি নাশতা দিচ্ছি।
আদিল: উঠবো যদি...
আমি: কি? (আদিল ইশারা দিয়ে ওর কপাল দেখিয়ে দিলো, আমি মুচকি হেসে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলাম)
আমি: তাড়াতাড়ি এসো।
আদিল: ওকে।
নীরব: বন্ধুর বোনের সাথে প্রেম করা যে কতো কষ্টের এইটা এখন হারে হারে টের পাচ্ছি, আমার মতো কপাল যেন আর কোনো ছেলের নাহয় মাবুদ। (টেবিলে নাশতা সাজাচ্ছিলাম নীরব এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে কথা গুলো বললো)
আমি: মাথা এতো গরম কেন?
নীরব: ভাবি তুমিই বলো এতো ভয় নিয়ে প্রেম করা যায়? মিতুর কড়া হুকুম বাসার কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না, ওর সাথে আদিলের সামনে বুঝেশুনে কথা বলতে হবে।
আমি: আপাতত এভাবেই চলো সুযোগ বুঝে নাহয় আদিলকে জানাবে।
নীরব: আদিল মেনে নিলেই হলো।
আদিল: কি মেনে নিতে হবে রে? (নীরব খাবার মুখে দিচ্ছিল আদিল এসে শুনে ফেলাতে বিষম খেয়ে খাবার ফেলে দিলো)
আমি: এই নাও পানি খাও।
আদিল: হঠাৎ বিষম খেলি কেন?
আমি: উফফ চুপ করো তো।
নীরব: শুধু কি শেষের কথাটাই শুনেছিস নাকি...
আমি: ভয় নেই ও কিছু শুনেনি।
আদিল: আরে কি নিয়ে কথা হচ্ছে সেটা তো বলবে কেউ।
নীরব: বলছিলাম তোদের বাসররাত কেমন কাটলো? এতো কষ্ট করে সাজিয়ে দিলাম।
আদিল: তোর বাসরঘর নাহয় আমি আর আনিশা মিলে সাজিয়ে দিবো তাহলেই সমান সমান। (আদিলের কথা শুনে নীরব আমি দুজনেই মুচকি হাসছি)
নীরব: এখন তো বলবিই এখন তো আর জানিস না বাসরটা তোর বোনের সাথে হবে। (নীরব কথাটা বিড়বিড় করে বললেও আমি চেয়ার টেনে বসতে গিয়ে শুনে ফেললাম)
আমি: কি হচ্ছে বুঝে ফেলবে তো।
আদিল: দুজন বিড়বিড় করে কি কথা বলছ?
মিতু: ভাইয়া আমাকে আজকে কলেজে পৌঁছে দিবে?
আদিল: কেন তোর পা নেই?
মিতু: সবসময় মজা করো নাতো, রাস্তায় কয়েকটা ছেলে ডিস্টার্ব করে।
নীরব: আর কখনো বলেছিলি কথাটা? (নীরবের ধমক শুনে মিতু ভয়ে কেঁপে উঠলো মনে হচ্ছে কেঁদেই দিবে)
আদিল: নীরব আস্তে, মিতু আমিতো আনিশাকে নিয়ে হসপিটালে যাবো তুই নীরবকে সাথে নিয়ে যা।
মিতু: হুম। (নীরব এখনো মিতুর দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে আছে আর মিতু ভয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে)
আমি: নীরব রাগটা কমিয়ে নাও আজকে কিন্তু রোমান্স করার সুযোগ পেয়ে গেছ।
আদিল: কিসের রোমান্স? (আমিতো আস্তে বললাম নীরবকে ও শুনলো কিভাবে?)
আদিল: কি হলো?
নীরব: তোদের রোমান্সের কথা বলছিল। (এবার তো আদিল আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে আছে)
আদিল: আচ্ছা নীরব তুই এতোদিন যা করেছিস তা কি সত্যিই প্ল্যান ছিল নাকি এখন...
নীরব: তোর কি মনে হয় আমি এতোটাই খারাপ যে তোর ভালোবাসার দিকে হাত বাড়াবো? আমরা সবাই জানতাম তুই আনিশাকে ভালোবাসিস কিন্তু আম্মুর ভয়ে আনিশাকে কষ্ট দিচ্ছিলি, দাদুর সাথে প্ল্যান করে এতোকিছু করেছি। কারণ ভালোবাসার মানুষকে হারানোর ভয়ের চেয়ে বড় ভয় আর কিছুতে নেই। তোর বেলাতেও তাই হয়েছে, আমি আনিশাকে ভালোবাসি ও যদি তোকে ভুলে আমাকে ভালোবাসে এই ভয়ে তুই আম্মুর ভয় উপেক্ষা করে ওকে প্রপোজ করেছিস। তোদের মাঝখানে আমি না আসলে তুই কখনোই আম্মুর ভয়টাকে জয় করতে পারতি না।
আদিল: হুম।
নীরব: ভালোবাসায় বাধা আসবে এটাই স্বাভাবিক, ভীতুর মতো পিছিয়ে গেলে হয় না। তুই নিজেও জানিস আম্মু বাসায় আসার পর কি ঘটবে, আগেই বলছি যাই হয়ে যাক আনিশার হাত ছাড়িস না। (ওদের কথা শুনে আমার সত্যি খুব ভয় হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আদিলকে হারিয়ে ফেলবো নাতো?)
আদিল: আনিশা কি হলো?
আমি: হুম কিছুনা।
আদিল: কখন থেকে ডাকছি শুনছই না কি ভাবছ এতো?
আমি: কিছু নাতো।
আদিল: যাও রেডি হয়ে নাও।
আমি: হুম।
নীরব: ওকে হসপিটাল নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে?
আদিল: নীরব আমার মনে হচ্ছে কোথাও একটা ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে, আনিশাকে হসপিটাল নিয়ে গেলেই সবকিছুর সমাধান হবে।
নীরব: ঠিক আছে যা।
রেডি হয়ে আদিলের জন্য অপেক্ষা করছি কোথায় গেছে কে জানে। ফোন বেজে উঠলো আব্বু ফোন দিয়েছেন।
আমি: আব্বু..
আব্বু: আব্বুকে তো ভুলেই গেছিস।
আমি: ভুলিনি আব্বু।
আব্বু: তুই কি কোনো কিছু নিয়ে টেনশনে আছিস?
আমি: নাতো।
আব্বু: আমার তো মনে হচ্ছে তুই কিছু একটা আমার থেকে লুকাচ্ছিস।
আমি: কি লুকাবো?
আব্বু: বিয়ের দুদিন পর এসেছিলি আর আসার নাম নেই, তোর শাশুড়িকে একবার বলে দেখ।
আমি: আসবো আব্বু এতো চিন্তা করো নাতো আমি ভালো আছি।
আব্বু: নিজের বাবাকে একবার দেখতে আসতে পারিস না এ কেমন ভালো থাকা? এবার তো আমার সন্দেহ হচ্ছে।
আমি: কিসের সন্দেহ আব্বু? এতোটা রাস্তা কি আদিল আমাকে একা যেতে দিবে? ওর অফিস আছে তাই যেতে পারছি না।
আব্বু: আমিতো বলেছি আমি গিয়ে নিয়ে আসবো তোকে। (এসব ঝামেলার মধ্যে আব্বুর না আসাটাই ভালো, আব্বু একবার কিছু আন্দাজ করতে পারলে আমাকে আর এখানে রাখবে না)
আব্বু: কিরে আনিশা চুপ হয়ে আছিস কেন?
আমি: এমনি, তুমি চিন্তা করোনা আমি মা'কে বলে খুব শীঘ্রই আসবো।
আদিল: আনিশা রেডি হয়েছ?
আমি: হ্যাঁ আমি রেডি।
আব্বু: তোরা কি কোথাও যাচ্ছিস?
আমি: হ্যাঁ আব্বু, এসে তোমাকে সব বলবো।
আব্বু: ঠিক আছে যা।
ফোন রেখে ভাবছি এখন বাসায় গেলে চলবে না আগে এদিকের সব রহস্য আমাকে জানতে হবে, ততোদিন নাহয় আব্বুকে কোনো কিছু বলে বুঝাবো। আব্বুকে আপাতত কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না।
আদিল: আনিশা চলো... (আদিল আমার সামনে এসেই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল)
আমি: কি দেখছ?
আদিল: চুল গুলো ছেড়ে রেখেছ তো কিছু চুল তোমার ঠোঁটের নিচে থাকা তিলটার উপরে এসে পড়েছে আর তোমার মুখের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। (আদিল আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ওর বুকে হাত রেখে থামাতে চাইলাম কিন্তু আদিল আমার হাত সরিয়ে দিলো)
আমি: আদিল কি হচ্ছে আমাদের বেরুতে হবে।
আদিল: হুম বেরুবো তো তার আগে তিলটায় ঠোঁট না ছুঁয়ালে শান্তি পাবো না। (আদিল আমার দুগাল ধরে আমার দিকে ঠোঁট এগিয়ে আনছে, ওর নিঃশ্বাস আমার মুখে পড়তেই চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আদিল চুমু দিচ্ছে না বলে চোখ খুলে তাকালাম, আদিল আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে দেখে বেশ আশ্চর্য হলাম)
আমি: আদিল...
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: এই আদিল।
আদিল: হুম।
আমি: কি হয়েছে থেমে গেলে যে?
আদিল: তোমার ঠোঁটের নিচে তিল আছে কিন্তু...
আমি: কি?
আদিল: দাঁড়াও আসছি আমি।
আমি: আরে কোথায় যাচ্ছ?
আদিল তাড়াহুড়ো করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল, আদিলের পিছু পিছু আমিও ছুটলাম।
আদিল মায়ের রুমে এসে কি যেন পাগলের মতো খুঁজছে। আলমারির সবকিছু ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে।
আমি: কি করছ এসব মা এসে দেখলে রেগে যাবে।
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: আদিল থামো বলছি।
আদিল: এইতো পেয়েছি।
আমি: কি? (আদিল একটা ছবি বের করে এনেছে একবার ছবির দিকে তাকাচ্ছে তো একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে। কার ছবি ভাবতে ভাবতে আদিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর হাত থেকে ছবিটা আনলাম। ছবির দিকে তাকিয়েই কেঁপে উঠলাম, আমার হাত কাঁপতে কাঁপতে ছবিটা নিচে পড়ে গেল। আমি ফ্লোরেই বসে পড়লাম, ফ্রেমের কাঁচগুলো ভেঙে ছবিটা ফ্লোরে পরে আছে, মনে হচ্ছে ছবির মানুষ দুটু আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে)
আদিল: আনিশা দেখো তোমার ঠোঁটের নিচে তিল আছে কিন্তু ছবিটাতে যে মেয়ে আছে তার ঠোঁটের নিচে তিল নেই তারমানে এই মেয়ে তুমি নও, আনিশা শু... (আদিল আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে)
আদিল: কি হয়েছে তোমার? ছবিটা দেখে এমন করছ কেন?
আমি: ও তোমার ভাইয়া তাই না?
আদিল: হ্যাঁ তুমি চিনো?
আমি: উনি কোথায়?
আদিল: হসপিটালে, কিন্তু তুমি ভাইয়াকে চিনো কিভাবে? তাহলে কি আম্মুর কথাই ঠিক?
আমি: আমাকে হসপিটাল নিয়ে চলো।
আদিল: আগে বলো ছবির মেয়েই কি তুমি? ভাইয়ার ছবি দেখে তুমি এতো ভয় পেয়ে গেছ কেন? তারমানে কি আম্মু প্রতিশোধ নিয়ে ভুল কিছু করেনি?
আমি: বললাম তো আমাকে হসপিটাল নিয়ে চলো।
আদিল: কিন্তু আম্মু আছে ওখানে।
আমি: সবার আগে উনারই সত্যিটা জানা প্রয়োজন।
আদিল: কোন সত্যি?
আমি: সেটা নাহয় তোমার ভাইয়ার মুখ থেকেই শুনবে।
আদিল: হুম চলো।
ছয়মাস আগে এতো খুঁজেও আমি রাইমার সুইসাইড এর কারণ খুঁজে পাইনি কিন্তু আজ তো মনে হচ্ছে রাইমা আদিলের ভাইয়ার জন্যই সুইসাইড করেছিল। রাইমা আমাকে ওর রিলেশনের ব্যাপারে কিছুই বললো না? যদি আদিলের ভাইয়া সত্যি রাইমাকে ভালোবেসে থাকে তাহলে রাইমা সুইসাইড করলো কেন আব্বু আর আমাকে বলেনি কেন? সুইসাইড নোটে কেন রাইমা লিখেছিল নিয়তি ওর সাথে বেঈমানি করেছে?
আদিল: আনিশা?
আমি: হুম। (গাড়িতে বসে আনমনা হয়ে এসব ভাবছিলাম আদিলের ডাকে হুশ ফিরতেই সামনে তাকালাম, মানসিক হসপিটালের সামনে এসে গাড়ি থেমেছে দেখে বেশ অবাক হলাম। তাহলে কি আদিলের ভাইয়া...)
আদিল: চলো।
আমি: তোমার ভাইয়ার নাম কি? (আমার প্রশ্ন শুনে আদিল বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে)
আদিল: যাকে ভালোবাসতে তার নামটাই জানোনা?
আমি: এতো প্রশ্ন করো নাতো।
আদিল: হুম ভাইয়ার নাম আবির।
আমি: হুম।
আবির ভাইয়ার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম উনার চুলগুলো লম্বালম্বা, পায়ে শিখল বাধা, দুহাতে দুই নার্স ধরে রেখেছে আর মা খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। ভাইয়া তো খেতে চাইছে না উল্টো খাবার বারবার ফেলে দিচ্ছে। হঠাৎ উনার নজর আমার আর আদিলের দিকে পড়লো, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি কি করবো বুঝতেই পারছি না ঠাই দাঁড়িয়ে আছি।
মা: এই মেয়ে কেন এসেছ এখানে?
ভাইয়া: ওকে বকো না। (সবাই অবাক হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছে, আমরা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম ভাইয়া কুড়িয়ে কুড়িয়ে আমার দিকে আসছেন)
মা: আদিল যদি এই মেয়ের জন্য আমার আবিরের কিছু হয়েছে তাহলে আমি এই মেয়েকে খুন করবো।
আদিল: আম্মু শান্ত হও, দেখো ভাইয়া আনিশাকে দেখার পর থেকে কেমন শান্ত হয়ে গেছে।
নার্স: হ্যাঁ এর আগে কখনো উনি এভাবে শান্ত হয়ে থাকেননি। (ভাইয়া এসে আমার গালে মুখে হাত বুলাচ্ছেন উনার দুচোখে পানি টলমল করছে)
মা: দেখেছ আবির তোমাকে কতোটা ভালোবাসে আর তুমি কিনা ওকে ঠকিয়েছ।
আদিল: কেন ঠকিয়েছিলে ভাইয়াকে? ভাইয়া তো তোমাকে ভালোবাসে। তোমার জন্য শেষ পর্যন্ত ভাইয়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছয়মাস ধরে এই মানসিক হসপিটালে আছে।
আমি: (নিশ্চুপ)
মা: এখন কোনো কথা বলছ না কেন? আমার ছেলেটাকে পাগল বানিয়ে সুখে আছ তো? (ভাইয়া আমাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো আমার তো বিয়ে হয়ে গেছিল হাজবেন্ড কোথায়, ভাইয়া আমার সাথে ইশারায় কথা বলছে দেখে নার্স সহ সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে)
আদিল: ভাইয়া তোমার সাথে ইশারায় কথা বলছে কেন?
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: আরে বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন?
মা: আমার ছেলের সাথে বেঈমানি করেছে ওর জন্য আজ আমার ছেলে পাগল হয়ে এখানে পড়ে আছে, এই মেয়ে আবার কথা বলবে কি?
আমি: যারা সত্যিকারের ভালোবাসে তারা একে অপরের সাথে কখনো বেঈমানি করে না, বেঈমানি করে তো তৃতীয় কোনো ব্যক্তি। (ভাইয়া আমার গালে হাত বুলাচ্ছিল চুল ধরে হাসছিল হঠাৎ আমার কথা বলা শুনে ভয় পেয়ে দূরে সরে গেল)
মা: কি হয়েছে আবির?
আবির: রাইমা তুমি কথা বলতে পারো কিন্তু তুমি তো...
আমি: আমি আপনার রাইমা নই, আমি রাইমার জমজ বোন আনিশা। (আমার কথা শুনে সবাই হা হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে)
আমি: রাইমা আর আমাকে ছিনার দুটু উপায় ছিল আমার ঠোঁটের নিচে তিল আছে কিন্তু রাইমার নেই, আমি কথা বলতে পারি কিন্তু রাইমা কথা বলতে পারতো না কারণ ও বোবা ছিল।
আদিল: এসব তুমি কি বলছ?
আবির: রাইমা কোথায়? ওহ ওর তো অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে নিশ্চয় স্বামীর সাথে আছে।
আমি: না সেদিন রাইমার বিয়ে হয়নি, বিয়ের সাজে সেজেছিল ঠিকই কিন্তু বিয়েটা হয়নি কারণ ও সেদিন সুইসাইড করেছিল।
আবির: আমার রাইমা...
কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে বসে পড়লাম, আমার বোন এতোটা কষ্ট নিয়ে মারা গেছে আর আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। ও এতোটাই চাপা স্বভাবের ছিল যে কাউকে ভালোবাসে এই কথাটা আমাকে পর্যন্ত বলেনি। ভাইয়ার দিকে তাকালাম রাইমা রাইমা বলে চিৎকার করে আবার পাগলামি শুরু করেছে আর নার্স'রা সামলানোর চেষ্টা করছে। একজন ভালোবাসার জন্য সুইসাইড করলো আর একজন ভালোবাসা হারিয়ে পাগল হয়ে মানসিক হসপিটালে আছে, দুজনের ভালোবাসাই তো সত্যি ছিল তাহলে ওদের মিল হলো না কেন? আচ্ছা এসবে তৃতীয় কারো হাত নেই তো? যে ওদের আলাদা করে দিয়েছে...
চলবে😍
