তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১২



চুপ হয়ে বালুচরে বসে আছি আর আদিলের দুষ্টুমি দেখে মিটিমিটি হাসছি। আদিল আমার কোলে শুয়ে আমার হাত নিয়ে খেলা করছে, কখনো হাতে চুমু দিচ্ছে তো কখনো আমার হাতের আঙ্গুলের ভাজে ভাজে ওর হাতের আঙ্গুল ঢুকাচ্ছে আর আমি ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে এবার বাসায় যাওয়া প্রয়োজন।
আমি: আদিল উঠো অন্ধকার নেমে আসছে বাসায় যেতে হবে তো।
আদিল: তোমার কোলে শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে, সব কষ্ট যেন আমার জীবন থেকে পালিয়ে গেছে আর সুখ গুলো সব আমাকে ঘিরে ধরেছে।
আমি: বাসায় গিয়েও তো আমার কোলে ঘুমাতে পারবে, চলো এখন।
আদিল: এই প্রকৃতির মাঝে যেমন সুখ পাবো তেমন সুখ কি ওই চার দেয়ালের ভিতরে পাবো? ওই বাসায় তো আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
আমি: তোমার আনিশা আছে তো, আর দম বন্ধ হয়ে আসবে না। আমার ভালোবাসায় তোমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিবো।
আদিল: আর একটু থাকি এখানে প্লিজ! (আদিল পাশ ফিরে আমার পেটে নাক ঘষতে শুরু করে দিলো)
আমি: আদিল কি হচ্ছে? আশেপাশে মানুষ আছে তো।
আদিল: আমি কাউকে ভয় পাই নাকি?
আমি: কিন্তু লজ্জার তো একটা ব্যাপার আছে।
আদিল: এতো লজ্জা কিসের? (আদিল উঠে বসে আমার নাকে ওর নাক ঘষে দিলো)
আমি: প্লিজ বাসায় চলো।
আদিল: বাসায় যেতে ইচ্ছে হয় না আবার সেই অভিনয় করতে হবে তোমার সাথে।
আমি: মা বাসায় নেই আজ অন্তত অভিনয় করতে হবে না।
আদিল: ঠিক আছে চলো। (কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো তারপর মুচকি হেসে হাটা শুরু করলো)

আদিলের হাত ধরে হাটছি আর মাঝেমাঝে আড়চোখে ওকে দেখছি, আদিল আনমনা হয়ে হাটছে। বাতাসে মাঝেমাঝে আমার চুগুলো উড়ে গিয়ে আদিলের উপর পড়ছে আর ও এতটুকুও বিরক্ত না হয়ে উল্টো চোখ বুজে উপভোগ করছে।
আদিল: এভাবে হাসছ কেন? (আশ্চর্য হয়ে তাকালাম ওর দিকে, ও তো একবারো আমার দিকে তাকায়নি তাহলে বুঝলো কিভাবে আমি মিটিমিটি হাসছি)
আদিল: ড্যাবড্যাব করে কি দেখছ এর আগে আমাকে দেখনি?
আমি: এর আগে তো মানহার আদিলকে দেখেছি।
আদিল: এখন কার?
আমি: কার আবার আমার।
আদিল: যদি হারিয়ে যাই? (আদিলের হাতের মুঠো থেকে আমার হাত ছাড়িয়ে এনে দাঁড়িয়ে পড়লাম, আদিল আমার কাছে এসে হাসতে শুরু করল)
আদিল: পাগলী মজা করেছি তো।
আমি: আর কখনো এমন মজা করবা না।
আদিল: ওকে এবার হাসো। (আদিল দুহাতে আমার গাল টেনে দিলো পাগল একটা। দুহাতে আদিলের হাত জড়িয়ে ধরে হাটতে শুরু করলাম)
আদিল: আনিশা সবসময় এভাবে আমরা দুজন একসাথে চলতে পারবো তো?
আমি: তোমাকে ছেড়ে কখনো যাবো না।
আদিল: কিন্তু পরিস্থিতি যদি আলাদা করে দেয়?
আমি: তুমি কিসের ভয় পাচ্ছ বলতো।
আদিল: আম্মু আমাদের মেনে নিবে না।
আমি: কিন্তু কেন?
আদিল: কারণ তুমি...
আমি: থেমে গেলে কেন বলো আমি কি অন্যায় করেছি যে তোমরা আমাকে এতো শাস্তি দিচ্ছ।
আদিল: বলবো কিন্তু এখন না।
আমি: কখন? মা আমাদের আলাদা করে দিলে পর?
আদিল: উঁহু কাল তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো আর কিছু জিনিস দেখাবো তাহলেই তুমি সব বুঝতে পারবে।
আমি: ঠিক আছে।

বাসায় এসে কলিংবেল চাতপেই মিতু এসে দরজা খুলে দিল।
মিতু: বাব্বাহ্ আপনাদের রোমান্স করা শেষ হইছে তাহলে? (আদিল মিতুর মাথায় আস্তে একটা থাপ্পড় দিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো)
মিতু: বুয়া চলে গেছে রান্না করবে কে আমার খুব খিধে লেগেছে।
আদিল: আমার বউ রান্না করে দিতে পারবে না নিজের খাবার নিজে রান্না করে খা।
মিতু: বাব্বাহ্ একদিনেই বউ পাগলা হয়ে গেলি?
আমি: মিতু আমি রান্না করছি একটু অপেক্ষা করো।
মিতু: হ্যাঁ তাড়াতাড়ি রান্না করো আর শুনো আমার সব পছন্দের খাবার আজ রান্না করবে।
আদিল: ওই আম্মু তো বাসায় নেই তাহলে অভিনয় কেন করছিস?
মিতু: অভিনয় না সত্যি আজ আমার সব প্রিয় খাবার খেতে ইচ্ছে করছে।
আমি: আচ্ছা কিসের অভিনয়ের কথা বলছ তোমরা?
আদিল: মিতু তোমার সাথে যে খারাপ ব্যবহার করে সেটা শুধুমাত্র আম্মুর ভয়ে, মন থেকে ও কখনো তোমাকে কষ্ট দিতে চায়নি। (ওদের ভাই বোনের দিকে তাকালাম শুধুমাত্র মায়ের ভয়ে ওরা আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, কিন্তু কেন?)
আমি: মিতু তোমার পছন্দের খাবার কি কি বলো আমি রান্না করে দিচ্ছি।
মিতু: ভাইয়া তো জানে ভাইয়া তোমাকে হেল্প করবে।
আদিল: কি?
মিতু: আমাকে রান্না করে খাওয়াবি যা যা। (ভাইবোন ঝগড়া করছে দেখে আমি হাসতে হাসতে রান্না ঘরের দিকে চলে আসলাম, মা বাসায় থাকলে ওদের ভাইবোনের মধ্যে এই মিষ্টি ঝগড়াটা কখনো হয় না)

আদিল: বউ... (একমনে রান্না করছিলাম হুট করে আদিল এসে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো, কেঁপে উঠে ওর দিকে ঘুরে তাকালাম)
আমি: হুট করে এভাবে কেউ জড়িয়ে ধরে আমিতো ভয় পেয়ে গেছি।
আদিল: কতো আদর করে বউ বলে ডাকলাম আর তুমি...
আমি: ছাড়ো রান্না শেষ করতে হবে তাড়াতাড়ি।
আদিল: ঠিক আছে আমি হেল্প করছি।
আমি: আগে কখনো করেছ?
আদিল: হুম আম্মুর সাথে মাঝেমাঝে করেছি তবে এখন আর করা হয় না কারণ...
আমি: কি কারণ?
আদিল: কিছুনা। (আদিল মৃদু হেসে কাজ করতে শুরু করলো, ওরা যে আমার থেকে কি লুকাচ্ছে ভেবেই পাচ্ছি না)

আদিল টেবিলে খাবার সাজাচ্ছে আর আমি পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছি, একটা ছেলে এতোকিছু করতে পারে?
আদিল: মিতু খাবার রেডি দাদুকে নিয়ে আয় আর নীরবকেও ডেকে নিয়ে আয়।
মিতু: আসছি।
আদিল: কি দেখছ ম্যাডাম?
আমি: একটা ছেলে কি করে মেয়েদের কাজ এতো সুন্দর করে গুছিয়ে করছে সেটাই দেখছি।
আদিল: দেখেছ আমি সব কাজ পারি, শুধু ওই প্রপোজটা ছাড়া আরকি। (আদিল হাসছে, এই প্রথম ওকে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে দেখছি)
আদিল: মাঝেমাঝে এসব কাজ না পারলেও বউকে খুশি করার জন্য করতে হয়, আর আমিতো পারি তাহলে করবো না কেন?
আমি: কিন্তু লোকে যে মন্দ বলবে।
আদিল: লোকের কথায় আমি কখনো কান দেই না, লোকের কাজই হলো অন্যের নিন্দা করা। স্ত্রীরা সারাদিন আগুনের কাছে থেকে রান্না করবে সংসারের আর দশটা কাজ সামলাবে এসব লোকের চোখে পড়বে না কারণ ওরা মনেপ্রাণে ধরে নিয়েছে মেয়েদের জন্মই হয়েছে এগুলো করার জন্য কিন্তু কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে কোনো কাজে একটু হেল্প করলো আর সেটা লোকের চোখে পড়লো তাহলে নিন্দা করতে দুবার ভাববে না, ছেলেটা বিয়ের পর নষ্ট হয়ে গেছে, কেমন বউ নিজের স্বামীকে দিয়ে কাজ করায়, বউটা মনে হয় জাদু জানে আরো নানান কথা। ওদের এসব বলার একটাই কারণ ওইযে ওরা ধরে নিয়েছে সংসার সামলানো মেয়েদের কাজ, মেয়েদের কাজ পুরুষ করবে কেন? কিন্তু ওরা তো এইটা বুঝে না যে স্ত্রীর হাতে হাতে সামান্য একটু কাজ করে দিলেই স্ত্রীরা খুশি হয়ে সারাদিনের সব ক্লান্তি ভুলে যায়, ওদের মনে স্বামীর প্রতি বিশ্বাসটা আরো দৃঢ় হয় যে নাহ মানুষটা আমাকে সত্যি অনেক ভালোবাসে। (মিতু এসে আদিলের মাথায় আস্তে একটা কিল দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লো ব্যস দু ভাইবোন ঝগড়ায় মেতে উঠেছে, আমি মুগ্ধ নয়নে আদিলকে দেখছি একটা মানুষ এতোটা ভালো হতে পারে? একটা মানুষের মধ্যে এতো গুলো গুণ?)
দাদু: দেখেছিস নাতবৌ তুই কাকে ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলি? আমার দাদু ভাই একদম...
নীরব: ও ভালো আর আমি খারাপ তাই না?
দাদু: আরে না না সেটা কখন বললাম? তুই বিয়ে করে বউ নিয়ে আয় তোর বউয়ের সামনেও তোর প্রশংসা করবো।
আদিল: দাদু তোমরা শুরু করো আমরা ফ্রেশ হয়ে আসছি।
মিতু: আজকে আমার পছন্দের সব খাবার যেহেতু আমরা একসাথে খাবো আজ।
আদিল: হ্যাঁ খাবো তো ফ্রেশ হয়েই আসছি।
মিতু: ফ্রেশ হতে রুমে যেতে হয়? একদিন অন্য কোথাও ফ্রেশ হওয়া যায় না? দাদুর রুম কাছে আছে যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।
আদিল: এই তোর মতলব কি?
মিতু: ভাবি দেখেছ কি বলে?
আমি: আদিল থাক না ও যখন চাইছে দাদুর রুমেই তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এসো।
আদিল: হুহ।

ফ্রেশ হয়ে দাদুর রুমে দাঁড়িয়ে আদিলের জন্য অপেক্ষা করছি আর দেয়ালে থাকা দাদির ছবিটা দেখছি। ছোট বড় অনেক ছবি দেয়ালে টাঙানো এর মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়, বুড়ো বয়সেও দাদুর রুমে দাদির এতো গুলো ছবি নিশ্চয় দুজনের মধ্যে ভালোবাসাটা খুব বেশি ছিল।
আদিল: এতো মনোযোগ দিয়ে দাদির ছবিতে কি দেখছ? (আদিল এসে আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো)
আমি: ভাবছি দাদু আর দাদির মধ্যে অনেক ভালোবাসা ছিল নিশ্চয়।
আদিল: জ্বী ছিল, আর এই ভালোবাসাটা এখন থেকে আমাদের মধ্যেও থাকবে। (আদিল আমাকে ঘুরিয়ে দিয়ে দুহাতে আমার দুগাল ধরে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে, ওর এই চাহনিতে কেমন যেন নেশা নেশা ভাব আছে। ভ্রু কুঁচকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি? আদিল মুচকি হেসে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। ওর দু ঠোঁট আমার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে চোখ বন্ধ করে ফেললাম)
মিতু: ভাইয়া তোদের হলো?
আদিল: উফফ ডাক দেওয়ার আর সময় পেলো না। (আদিলের মুখের অবস্থা দেখে না হেসে পারলাম না)
আদিল: তুমি হাসো বেশি করে হাসো কিন্তু মনে রেখো আজকের রাতটা আমার।
আমি: মানে?
আদিল কিছু না বলে মুচকি হেসে চলে গেল।

দাদু: অনেক দিন হলো একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া হয় না, ভাবছি আজকে তোদের সাথে আড্ডা দিবো। (দাদু সোফায় বসতে বসতে কথাটা বললেন, আদিল রুমের দিকে যাচ্ছিল কথাটা শুনে দাদুর দিকে তাকিয়ে রাগে লুচির মতো ফুলছে)
দাদু: নাতবৌ হাতের কাজ গুলো সেড়ে আয় আজ তোদের সাথে আড্ডা দিবো।
আমি: এইতো দাদু শেষ আসছি দু মিনিট লাগবে।
মিতু: আমি চলে যাচ্ছি আমার পড়া আছে।
দাদু: তুই আবার পড়তেও জানিস?
মিতু: ভাবির হুকুম রেজাল্ট ভালো না হলে খাবার বন্ধ।
নীরব: ভাবি এইটা একদম ঠিক কাজ করেছে, আমি যাই ঘুমাবো। (নীরব আর মিতু চলে গেল, আদিল এসে দাদুর পাশে বসলো। আমি সবকিছু গুছিয়ে এসে ওদের কাছে বসলাম)
আদিল: আচ্ছা দাদু তুমি কি আজ আমাদের রুমে যেতে দিবে না?
আমি: আদিল কি হচ্ছে?
দাদু: দেখেছিস নাতবৌ তোর সাথে একটু গল্পও করতে দিবে না।
আমি: ও চলে যাক দাদু আমি তোমার সাথে গল্প করবো।
আদিল: আমি আমার বউ রেখে যাবো না।
দাদু: আদিলের প্রেম কাহিনী তো আমি জানি বেচারা তোকে রেলস্টেশনে দেখেই প্রেমে পরে গিয়েছিল, এবার তোর প্রেম কাহিনী বলতো।
আমি: আমার কোনো প্রেম কাহিনী নেই।
দাদু: আদিলের প্রেমে কিভাবে পড়লি? এর আগে যারা ছিল তাদের ভুলে আদিলকে ভালোবাসলি কিভাবে? এসব কিছুই বল।
আমি: এর আগে তো কাউকে ভালোবাসিনি আদিলকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
দাদু: সত্যি এর আগে তোর কারো সাথে রিলেশন ছিলনা? (আদিল আর দাদু অবাক হয়ে একজন আর একজনের দিকে তাকাচ্ছে)
আমি: তোমরা এতো অবাক হচ্ছ কেন?
দাদু: এইটা কিভাবে সম্ভব? তুই সত্যি বলছিস তো?
আমি: অজতা মিথ্যে বলতে যাবো কেন?
দাদু: আদিল আমার মনে হচ্ছে আমাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, আমার তো মনে হচ্ছে আনিশা এসব ব্যাপারে কিছুই জানেনা। আনিশাকে সব জানানো প্রয়োজন।
আদিল: হ্যাঁ দাদু আমারো তাই মনে হচ্ছে কোথাও একটা ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে। কাল আনিশাকে নিয়ে যাবো তাহলেই সব ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটবে।
দাদু: হ্যাঁ তাই কর।
আমি: আমি জানিনা তোমরা কিসের কথা বলছ তবে কাল যখন কোথাও নিয়ে যাবে বলছ তাহলে কালই নাহয় সব জানবো। দাদু অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমুতে যান নাহলে কিন্তু শরীর খারাপ করবে।
আদিল: আনিশা তুমি রুমে যাও আমি দাদুকে রুমে দিয়ে আসছি।
আমি: ঠিক আছে।
চলে আসার সময় দেখলাম দাদু বারবার আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন, জানিনা কাল আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে।

রুমের দরজা খুলা দেখে বেশ অবাক হলাম, রুমের ভিতর থেকে কারো কথা ভেসে আসছে। রুমের ভিতর ঢুকতেই নীরবের কন্ঠ শুনতে পেলাম।
নীরব: এই রাতটা আমাদের জীবনে কবে আসবে? (নীরব মিতুর কোমড় দুহাতে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর মিতু মাথা নিচু করে হাসছে। খাটের দিকে নজর পড়লো, পুরো খাট কাঁচা ফুলে সাজানো)
মিতু: প্লিজ ছাড়ো।
নীরব: আমিতো আমার বউকে ধরেছি তাহলে ছাড়বো কেন?
আমি: ওহ তাহলে এই ব্যাপার? (আমার কথা শুনে দুজন দুদিকে ছিটকে সরে গেল, নীরব মাথা চুলকাচ্ছে আর মিতু ভয়ে মাথা নিচু করে আছে)
আমি: বাসরের প্ল্যানিং হয়ে যাচ্ছে অথচ আমি কিছুই জানিনা?
নীরব: আজ তো তোমাদের বাসর আমরা কখন প্ল্যানিং করলাম?
আমি: আমিতো সবই শুনে ফেলেছি, এই রাতটা আমাদের জীবনে কবে আসবে? বাব্বাহ্ এতো দূর?
নীরব: ভাবি আদিলকে কিছু বলোনা প্লিজ!
আমি: কেন?
মিতু: ভাইয়া শুনলে আমাকে মেরেই ফেলবে।
আমি: কিন্তু এখন যদি আমার বদলে আদিল আসতো আর সব শুনে ফেলতো তোমাদের দুজনকে একসাথে দেখতো?
মিতু: সব দোষ ওর।
নীরব: রাগ করছ কেন সরি তো।
আমি: আচ্ছা এসব প্ল্যান কার?
নীরব: দাদুর।
আমি: সাজাচ্ছিলে বলেই সন্ধ্যা থেকে আমাদের রুমে আসতে দাওনি?
মিতু: হ্যাঁ এবার তোমাকে সাজাবো। তুমি যাও তো ভাইয়াকে রুমে আসতে দিওনা।
নীরব: ওকে।
আমি: মিতু কি হচ্ছে আদিল কিন্তু রেগে যাবে।
মিতু: হালকা একটু সাজাবো চলো।
আমি: না প্লিজ!
মিতু: ভাইয়ার বিয়েতে কোনো আনন্দ করতে পারিনি, শুধু বিয়েতে কেন এই চার দেয়ালের মধ্যেই তো কোনো আনন্দ নেই। আজ আম্মু বাসায় নেই তাই দাদুর সাথে সব প্ল্যান করেছি, ভাইয়া তুমি দুজনেই তো অনেক কষ্ট পেয়েছ আজ নাহয় সব কষ্টের অবসান হবে। প্লিজ আমার আনন্দটা আজ নষ্ট করে দিও না। (মিতুর দুচোখের কোণে পানি ছিকছিক করছে, জানিনা ওদের সবার মনে কিসের এতো কষ্ট)
আমি: ঠিক আছে আমি সাজবো কেঁদো না প্লিজ!
মিতু: হুম।

মিতু আমাকে বিয়ের কনের মতো সাজিয়ে খাটে বসিয়ে দিয়ে লাইট অফ করে চলে গেল। আদিল এসে এসব দেখলে কি ভাববে, ভাববে হয়তো এসব আমার প্ল্যান ছিঃ কি লজ্জার ব্যাপার। হঠাৎ লাইট জ্বলে উঠলো কেঁপে উঠে সামনে তাকালাম, আদিল হা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আদিলকে কি বলবো ভেবে পাচ্ছিনা তাই মাথা নিচু করে বসে আছি, আদিল এসে আমার পাশে বসে বিছানায় রাখা আমার হাতের উপর ওর হাত রাখলো।
আমি: এসব কিন্তু আমার প্ল্যান না আমি কিছুই জানতাম না।
আদিল: এতো ভয় পাচ্ছ কেন? আমি সব জানি দাদু আমাকে সব বলেছে। (আদিল আমাকে টেনে ওর কাছে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো, আদিল কাঁদছে বুঝতে পেরে ওর দিকে তাকালাম)
আমি: কি হয়েছে?
আদিল: কিছু নাতো।
আমি: কাঁদছ কেন?
আদিল: আমার জীবনে যে সবকিছু উলটপালট হয়ে গেছে এইটা ভেবে। দুমাস আগে তোমাকে ঠিক এমন সাজে রেলস্টেশনে দেখেছিলাম আর প্রথম দেখাতেই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম কিন্তু সেটা তোমাকে অনেক বার বলতে চেয়েও বলতে পারিনি।
আমি: তারমানে আমি দুমাস আগে যে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম তখন তুমি আমাকে দেখেছিলে?
আদিল: তাতো জানিনা তবে বিয়ের সাজেই দেখেছিলাম তোমাকে। প্রথম তো ভেবেছিলাম বিএফ সাথে পালিয়ে যাবে কিন্তু তোমাকে ফলো করে বুঝতে পারি বিএফ নেই, তারপর তোমার পিছু পিছু তোমার বাসা অব্ধি গিয়েছিলাম।
আমি: আর আমি বুঝতেও পারিনি হায়রে।
আদিল: লুকিয়ে তোমার ছবি তুলেছিলাম আর সেগুলো আম্মুকে দেখিয়ে তোমাদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, তারপর আর কি বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু বিয়ের দিন রাতে আম্মু সব উলটপালট করে দিলো। সেদিন রাতেও এই রুম এভাবে সাজানো ছিল তুমিও এই সাজে ছিলে কিন্তু আমাকে ফোনে কথা বলার মিথ্যে নাটক করতে হয়েছিল।
আমি: কি?
আদিল: হুম সেদিন ফোন কানে নিয়ে এমনি কথা বলার অভিনয় করেছিলাম তোমাকে এইটা বুঝানোর জন্য যে আমার জিএফ আছে।
আমি: আমি বুঝতেও পারিনি এতো বোকা আমি।
আদিল: তুমি সত্যিই বোকা। (অসহায়ের মতো আদিলের দিকে তাকালাম ও চুপচাপ আমার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে)
আমি: কি দেখছ?
আদিল: সেদিন তো বউ সাজে তোমাকে ভালো করে দেখতে পারিনি তাই আজ দুচোখ ভরে দেখছি। (ওর কথা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম)
আদিল: লজ্জা পেয়ে লাভ নেই আগেই বলেছিলাম আজ রাতটা আমার। (আদিল আমার হাতের আঙ্গুলের ভাজে ভাজে ওর হাতের আঙ্গুল গুলো ঢুকিয়ে দিয়ে আমাকে বিছানায় শুয়ে দিলো, আমার হাতে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে আমার চোখের দিকে তাকালো)
আদিল: আনিশা সামনে কিন্তু আমাদের জীবনে অনেক কিছু ঘটবে, আমি জানি আম্মু তোমাকে মেনে নিবে না আর আম্মু তোমার উপর অত্যাচার করে এইটা শুনলে তোমার আব্বুও হয়তো আমাদের আলাদা করতে চাইবে। আনিশা যাই ঘটে যাক আমার হাতটা ছেড়ো না প্লিজ! তুমি পাশে থাকলে আমি সব কষ্ট সহ্য করতে পারবো।
আমি: তোমাকে ছেড়ে কখনো যাবো না কথা দিলাম। (আদিল মৃদু হেসে আমার বুকে মাথা রাখলো, ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি আর ভাবছি সত্যি যদি মা আমাকে মেনে না নেন?)
আদিল: এতো ভয় পেতে হবে না আমি আছি তো।
এতোটাই ভাবনার জগতে ডুবে গিয়েছিলাম আদিল কখন আমার একদম কাছে চলে এসেছে বুঝতেই পারিনি। আদিল একহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে আর অন্যহাতে আমার কলাপে গালে গলায় স্পর্শ করছে, ওর গরম নিঃশ্বাস গুলো আমার মুখের উপর এসে পড়ছে। আদিল আমার দুচোখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে, মাতাল করার মতো চাহনি ওর। আদিল একটা আঙ্গুল আমার ঠোঁটে স্পর্শ করতেই আবেশে চোখ বুজে ফেললাম, ও আঙ্গুল সরিয়ে আমার দু ঠোঁটে ওর দু ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো...

চলবে😍
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url