তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১১



রাত একটা বাজে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছি ঘুম আসছে না কিছুতেই। কাল আদিল কি বলবে এইটা ভেবে ভয় হচ্ছে খুব। আচ্ছা আদিল যদি আমাকে মেনে না নেয়? গাঁ শিউরে উঠছে, খুব তো বলে দিলাম ও কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে আমি ঢাকা চলে যাবো আর ডিভোর্স পেপারে সাইন করে পাঠিয়ে দিবো কিন্তু সত্যি কি সেটা আমি পারবো? ভালোবাসি তো, ভালোবাসার মানুষকে ছাড়া বেঁচে থাকা কি এতোই সহজ? আদিলের দিকে তাকালাম সোফায় বসে ফোন টিপছে, হয়তো মানহার সাথে চ্যাট করছে। একদিকে মানহা তার উপর মা আমাকে পছন্দ করেন না সবকিছু ভেবে তো আদিল আমাকে ডিভোর্সই দিবে।
আদিল: ঘুমাচ্ছ না কেন? (আদিলের কথা শুনে ওর দিকে তাকালাম, সারাদিন কথা বলিনি যখন এখনো বলবো না)
আদিল: আরে বাবা তোমার শর্ত হচ্ছে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আমার সিদ্ধান্ত জানাতে হবে, তোমার শর্তে তো এইটা নেই যে আমার সাথে তুমি কথা বলবে না।
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: ওকে কথা না বললে নেই আমিও আর একা একা বকবক করবো না।
আদিল ফোন টিপছে আর মিটিমিটি হাসছে, এমন অবস্থায় ওর হাসি পাচ্ছে? নাকি আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এমন করছে? আদিলের হাসি একদম সহ্য হচ্ছে না।

ফারজানা: কি হয়েছে বলবি তো।
আমি: আমার আর আদিলের ডিভোর্স হয়ে যাবে হয়তো।
ফারজানা: মানে? কি বলছিস তুই বুঝতে পারছিস?
আমি: হ্যাঁ এটাই সত্যি।
ফারজানা: এক মাসও হয়নি বিয়ে হয়েছে আর এখনি ডিভোর্স, আমি না কিছু বুঝতে পারছি না।
আমি: আদিলের মা আমাকে পছন্দ করে না তাছাড়া আদিল মানহা নামের একটি মেয়েকে ভালোবাসে।
ফারজানা: বিয়ের আগে রিলেশন থাকেই তুই পারছিস না আদিলের ভালোবাসা জয় করে নিতে?
আমি: পারছি নাতো।
ফারজানা: একদম কান্নার ইমুজি দিবি না এইটা তোকে মানায় না। (ধ্যাত কষ্ট কমানোর জন্য ফারজানার সাথে চ্যাট করছি আর ও উল্টো রাগ দেখাচ্ছে আমাকে। হঠাৎ আদিলের দিকে চোখ পড়লো আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে ছিল আমি তাকাতেই চোখ সরিয়ে নিলো, আচ্ছা আদিল রাগ করল কেন?)
ফারজানা: আচ্ছা তোর কি মনে হয় ও তোকে এতটুকুও ভালোবাসে না?
আমি: আদিলের অনেক ব্যবহারে মনে হয় ও আমাকে ভালোবাসে। (আদিলের দিকে আড়চোখে তাকালাম রাগে ফুঁসছে, তাহলে কি মেসেঞ্জারের টুংটাং শব্দ শুনে আদিল রাগে ফুঁসছে?)
ফারজানা: তাহলে একটু পরীক্ষা করে দেখ।
আমি: কিভাবে?
ফারজানা: তুই বল তুই অন্য কোনো ছেলেকে ভালোবাসিস, এখনি এমন একটা ভাব কর যেন তুই কোনো ছেলের সাথে চ্যাটিং করছিস।
আমি: কাজ হবে?
ফারজানা: আদিল কি জেগে আছে?
আমি: হ্যাঁ আমার দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসছে।
ফারজানা: তাহলে কাজ হবে তুই ট্রাই করে দেখ, আমি ঘুমুতে যাই।
আমি: ওকে।

ফোনে হাতে নিয়ে এমনি হাসছি আর আদিলের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছি, হঠাৎ আদিল এক লাফে এসে আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিল।
আমি: কি হচ্ছে ফোন দাও বলছি।
আদিল: আগে আমি দেখবো তুমি কার সাথে মেসেঞ্জারে চ্যাট করছিলে।
আমি: যার সাথে খুশি চ্যাট করবো কথা বলবো তাতে তোমার কি? আমার ফোন দাও বলছি।
আদিল: দিবো না।
আমি: আদিল ফারাবী আমার মেসেজের অপেক্ষা করছে। (কথাটা ইচ্ছে করে বলেও এমন ভাব করলাম যেন ভুলে বলে ফেলেছি, আদিল ফোন বিছানায় রেখে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে)
আদিল: ফারাবী কে?
আমি: যেই হউক তাতে তোমার কি?
আদিল: তোমার ফোনটাই ভেঙে ফেলবো। (আদিল ফোন ছুড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছিল তাড়াতাড়ি ওর হাত ধরে ফেললাম, আদিল তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় শুয়ে পড়লো আর আমি ওর বুকে। আমার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আদিলের চোখেমুখে গিয়ে পড়েছে, ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। আদিলের চোখের কোণে পানি দেখে মুচকি হেসে ওর কপালে আমার ঠোঁট ছুঁয়ে দিলাম)
আমি: ফারাবী নামের কেউ নেই এমনি বলেছি। (উঠে চলে আসতে চাইলাম আদিল আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে আবার ওর বুকে আমাকে শুয়ে দিলো)
আদিল: মিথ্যে বললে কেন?
আমি: তুমি মিথ্যে বলো তাই।
আদিল: আমি কখন মিথ্যে বললাম?
আমি: এইযে ভালোবাস কিন্তু মুখে স্বীকার করনা এইটা একধরণের মিথ্যে নয়?
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: চব্বিশ ঘন্টা পার হতে আর বেশি সময় নেই।
আদিল: আছে তো অনেক সময় আছে।
আমি: ধ্যাত ছাড়ো আমাকে।
আদিল: ছাড়বো না।
আমি: যে আমাকে ভালোবাসে না তার বুকে ঘুমাব এতোটাও খারাপ মেয়ে আমি নই।
এবার আদিল আমাকে ছেড়ে দিল, আমি চুপচাপ সোফায় এসে শুয়ে পড়লাম। ভালোবাসি বলবে না আবার ন্যাকা কান্না কাঁদবে যত্তোসব।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে বিছানায় দেখে বেশ অবাক হলাম, আমি ঘুমানোর পর কি আদিল আমাকে বিছানায় নিয়ে এসেছে? মনে পড়ছে না, রুমের চারপাশে চোখ বুলালাম আদিল রুমে নেই। উঠে ফ্রেশ হতে চলে আসলাম।

কফির মগ হাতে নিয়ে রুমের দিকে যাচ্ছিলাম হঠাৎ মায়ের রুমের সামনে আসতেই কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম, রুমের ভিতর উঁকি দিতেই দেখলাম মা একটা ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। ভিতরে যাবো কিনা ভাবতে ভাবতে ভিতরে চলে আসলাম। মায়ের কাঁধে হাত রাখতেই উনি চমকে উঠলেন।
মা: কে?
আমি: মা আমি।
মা: এখানে কি করছ?
আমি: আপনি কাঁদছিলেন তাই...
মা: যাও এই রুম থেকে।
আমি: ছবিটা কার মা?
মা: বলেছি না যাও এখান থেকে। (মায়ের ধমক শুনে চলে আসার জন্য পা বাড়ালাম)
মা: শুনো।
আমি: হুম বলুন।
মা: তোমার কাটা জায়গার ক্ষত গুলো কমেছে?
আমি: কিছুটা।
মা: আদিল এর আগে কখনো এতোটা নেশা করেনি, যা হয়েছে তোমার সাথে সে জন্য...
আমি: এইটা তো হবারই ছিল মা, আপনারা চেয়েছিলেন অত্যাচার করতে আর এইটা তো অত্যাচার এর মধ্যেই পড়ে।
মা: বেশি বুঝনা তো। শুনো আজ আমি এক জায়গায় যাবো তুমি সবকিছু সামলে রেখো।
আমি: আসবেন না?
মা: আজ আসবো না।
আমি: ঠিক আছে।
মা: যাও।
চুপচাপ মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম, এই মহিলাকে কেমন যেন অদ্ভুত রকমের লাগে। কার ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন সেটা আর দেখা হলো না, আচ্ছা মা কোথায় যাবেন?

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল চব্বিশ ঘন্টা পার হয়ে গেল কিন্ত আদিল সিদ্ধান্ত জানালো না, সকাল থেকে আদিল বাসাতেই নেই কোথায় গেছে কে জানে।
আমি: আহ... (আনমনা হয়ে এসব ভাবছিলাম আর রান্না করছিলাম হঠাৎ গরম তেলের ছিটে এসে হাতে পড়ে গেল)
বুয়া: নতুন বউ দেখেশুনে কাজ করবে তো।
আমি: কিছু হবে না।
বুয়া: তোমার হাত কাটা আর তোমার শাশুড়ি বেড়াতে চলে গেল?
আমি: কোনো প্রয়োজনেই হয়তো গেছেন তাছাড়া আমার হাত অনেকটা ভালো হয়ে গেছে।
বুয়া: তুমি পারোও বটে।
আমি: আচ্ছা মিতুরা সবাই কোথায় গেছে?
বুয়া: মিতু কলেজে আর বাকি সবাই কই আছে জানিনা।
আমি: ওহ!

রান্না শেষ করে ফ্রেশ হয়ে দাদুকে ডাকতে আসলাম, দাদু চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে কি যেন ভাবছেন।
আমি: দাদু?
দাদু: আয়।
আমি: খাবেন চলুন।
দাদু: মিতু আদিল ওরা সবাই এসেছে?
আমি: না কেউ আসেনি, আচ্ছা আদিল কোথায়?
দাদু: জানিনা।
আমি: ওহ! দাদু একটা কথা।
দাদু: বল।
আমি: আমি আজ চলে যাচ্ছি।
দাদু: চলে যাচ্ছিস মানে?
আমি: আদিলকে চব্বিশ ঘন্টা সময় দিয়েছিলাম সিদ্ধান্ত জানানোর কিন্তু ও গায়েই মাখলো না, ছয়টার ট্রেনে আমি চলে যাচ্ছি।
দাদু: তারমানে আমার প্ল্যান বৃথা হয়ে গেল?
আমি: কিসের প্ল্যান?
দাদু: কিছুনা, তুই পাগলামি করিস না শু...
আমি: দাদু প্লিজ আর অনুরোধ করবেন না, আমিতো ওকে সুযোগ দিয়েছিলাম ও যদি সুযোগ কাজে না লাগায় সেটা কি আমার দোষ? আমিতো একটা মানুষ আমারো কষ্ট হয়, আমি সত্যি আর এসব নিতে পারছি না।
দাদু: ঠিক আছে আমি আর তোকে জোড় করবো না।
আমি: হুম চলুন খেয়ে নিবেন।
দাদু: হুম।

দাদুকে খাবার দিয়ে এসে চুপচাপ শুয়ে আছি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না কিছু ভালোও লাগছে না। আদিল আমার সাথে এইটা করতে পারলো? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল অথচ আদিল বাসায় আসার নাম নেই, তাহলে কি আদিল চায় আমি চলে যাই? আদিলের ব্যবহারে মনে হতো ও আমাকে ভালোবাসে কিন্তু মায়ের ভয়ে বলতে পারেনা। আজ তো মনে হচ্ছে আমি ভুল ছিলাম একদিন আদিল আমাকে ভালোবাসবে এইটা ভেবে আমি এতোদিন মরীচিকার পিছনে ছুটেছি। আমি আদিলকে ছিনতে এতো বড় ভুল করেছি ভাবতেই নিজের উপর রাগ হচ্ছে। খুব কান্না পাচ্ছে ভালোবাসায় এতো কষ্ট জানলে আমি কখনোই আদিলকে ভালোবাসতাম না।
মিতু: ভাবি... (মিতু ডাকতে ডাকতে রুমের দিকে আসছে শুনে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম)
মিতু: কি ব্যাপার শুয়ে আছ যে এখন খাবে না? দাদু বললো তুমি খাওনি।
আমি: ইচ্ছে করছে না।
মিতু: তুমি কাঁদছিলে?
আমি: নাতো।
মিতু: ভাইয়া বাসায় নেই এজন্য? আমিও বুঝতে পারছি না ভাইয়া কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গেল।
আমি: চব্বিশ ঘন্টা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
মিতু: শুনোনা ভাইয়া বোধহয় কোনো জরুরী কাজে আটকে গেছে তুমি প্লিজ একটু অপেক্ষা করো।
আমি: আমার থেকে বেশি ইম্পরট্যান্ট যে ওর কাছে কে সেটা তো আমি ভালো করেই জানি।
মিতু: কে?
আমি: কে আবার ওই শাঁকচুন্নি মানহা।
মিতু: মানহা কে?
আমি: দেখেছ তোমাদের কাউকে বলেনি মানহার কথা।
মিতু: ভাবি তুমি কি বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, তুমি প্লিজ ভাইয়ার জন্য আর একটু অপেক্ষা করো।
আমি: হুম ভালো যখন বাসি তখন তো অপেক্ষা করতেই হবে, তবে ছয়টার ট্রেনে চলে যাবো।
মিতু: হুম।

মিতু চলে গেল, আবার বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। নিশ্চয় আদিল মানহার সাথে আছে তাইতো আমার দেওয়া শর্ত ভুলে থাকতে পারছে, কেন যে এই লুচুটাকে ভালোবাসতে গেলাম। হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠলো, ফোন টেবিলের উপর রাখা আদিল ফোন করেছে ভেবে তাড়াহুড়ো করে এসে ফোন হাতে নিলাম, নাহ আদিল নয় তানিয়া ফোন করেছে।
আমি: হ্যালো।
তানিয়া: কিরে কেমন আছিস?
আমি: তানিয়া...
তানিয়া: আরে কাঁদছিস কেন কি হয়েছে?
আমি: আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমি বাসায় আসছি আজ।
তানিয়া: শান্ত হ আমার কথা শুন, ফারজানা আমাকে সব বলেছে।
আমি: (নিশ্চুপ)
তানিয়া: আমিতো ভাবতেই পারছি না যে আনিশা ছেলেদের পাত্তা দিতো না সে আজ একটা ছেলের অবহেলায় এভাবে কাঁদছে।
আমি: তুই কি বুঝবি তোর তো আর বিয়ে হয়নি।
তানিয়া: ওলে আমাল জামাই পাগলী রে। এই শুন কান্না বন্ধ কর নাহলে কোনো সাজেশন দিবো না কিন্তু।
আমি: হুম কাঁদবো না বল।
তানিয়া: তুই ঢাকা চলে আয়।
আমি: মানে?
তানিয়া: ভালোবাসার মানুষটা যখন ভালোবেসে পাশে থাকে তখন অপর মানুষটি তার মর্ম বুঝতে পারেনা কিন্তু ভালোবাসার মানুষ যখন চোখের আড়াল হয়ে যায় তখন ঠিকই তাকে মিস করে তার শূন্যতা অনুভব করে। আমি বলছি তুই একবার ভাইয়ার চোখের আড়াল হ দেখবি ভাইয়া তোর শূন্যতা অনুভব করবে তোকে মিস করবে আর তোকে ছাড়া থাকতে না পেরে তোর ভালোবাসার কাছে ধরা দিবে।
আমি: শূন্যস্থান খালি থাকলে তো শূন্যতা অনুভব করবে?
তানিয়া: মানে?
আমি: ও অন্য কাউকে ভালোবাসে।
তানিয়া: ট্রাই করতে তো দোষ নেই, তুই ঢাকা চলে আয় দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি: ঠিক আছে।
তানিয়া: বাসায় এসে ফোন করিস রাখছি।
আমি: ওকে।

ব্যাগ গুচাচ্ছি আর চোখের পানি মুছছি বিকেল হয়ে গেছে এখনো আদিলের আসার নাম নেই, আসলে ও আমার দেওয়া চব্বিশ ঘন্টার কথা ভুলেই গেছে। হারানোর ভয় নেই তো তাই এমন করতে পেরেছে যদি হারানোর ভয় থাকতো তাহলে ঠিক চলে আসতো। আমিও চলে যাবো, কি পেয়েছে আমাকে আমার ভালোবাসা এতোই সস্তা?
নীরব: আনিশা... (নীরব এসেছে দেখেও কথা বললাম না)
নীরব: চলে যাচ্ছ?
আমি: হুম।
নীরব: তোমার কাছে আদিল সব আর আমার ভালোবাসা কিছুই না?
আমি: নীরব প্লিজ!
নীরব: একা যাবে?
আমি: হুম।
নীরব: ঠিক আছে চলো আমি স্টেশন অব্ধি পৌঁছে দিচ্ছি।
আমি: প্রয়োজন নেই।
নীরব: এইটুকু অন্তত করতে দাও।
আর কিছু বললাম না চুপচাপ বেরিয়ে পড়লাম।

আদিল: আনিশা দাঁড়াও প্লিজ! (বালুচর ধরে আনমনা হয়ে হাটছিলাম হঠাৎ আদিলের কন্ঠ শুনে পিছনে তাকালাম, আদিল দৌড়ে আমাদের কাছে আসছে দেখে থেমে গেলাম)
নীরব: এই শালার এখন আসার সময় হয়েছে।
আমি: নীরব চলো।
নীরব: চলো মানে আদিল আসছে তো।
আমি: আসুক আমি আর অপেক্ষা করতে পারবো না।
নীরব: ঠিক আছে।
আদিল: আনিশা শুনো... (আদিল আমার কাছে এসে হাঁপাতে শুরু করলো)
নীরব: আদিল তোর আসতে যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে, আনিশা আমার প্রপোজ একসেপ্ট করে নিয়েছে।
আদিল: কি? (আদিল আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আর আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি নীরবের দিকে, কেন মিথ্যে বলছে নীরব?)
নীরব: আনিশা আগে ফুল ছাড়া প্রপোজ করেছিলাম এখন... (নীরব আমার সামনে একটা গোলাপ ধরতেই আদিল গোলাপটা কেড়ে নিলো)
আমি: এই মাঝ রাস্তায় তোমরা কি শুরু করেছ?
আদিল: আনিশা আমি তোমাকে ভালোবাসি। (আদিল হাঁপাতে হাঁপাতে আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে পড়লো, ফুল কি নিবো ও তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গোলাপ উল্টো ধরেছে দেখে নীরব আমি দুজনেই ফিক করে হেসে দিলাম। আমাদের হাসি দেখে আদিল ফুলের দিকে তাকালো)
আদিল: এই সরি সরি! আনিশা আমি আর রিস্ক নিতে পারবো না এই শালা নীরবকে বিশ্বাস নেই। আমি এর আগে কখনো কাউকে প্রপোজ করিনি তাই কিভাবে করতে হয় জানিনা, তবুও করছি প্লিজ একসেপ্ট করে নিও।
নীরব: গোধূলি সন্ধ্যা সমুদ্রের পাড়ে ফুরফুরে বাতাস সূর্যটাও রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের বুকে ডুব দিবে, ওয়াও রোমান্টিক ওয়েদার তাড়াতাড়ি প্রপোজ কর শালা।
আদিল: আনিশা তুমি কি আমার বাচ্চাকাচ্চার আম্মু হবে? (ওর কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি আর নীরব হাসতে হাসতে বালুতেই বসে পড়েছে)
আদিল: হয়নি প্রপোজ? (আদিল উঠে আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে আমার কপালে ওর কপাল ঠেকালো, ওর হাত থেকে গোলাপ আনলাম)
আমি: হুম হয়েছে।
নীরব: আনিশা তুমি কি আমার বাচ্চাকাচ্চার আম্মু হবে? এই এইটা কেমন প্রপোজ? তোকে শালা আমার বন্ধু বলতেও লজ্জা হচ্ছে এতো আনরোমান্টিক।
আদিল: আনিশা আমার প্রপোজ একসেপ্ট করেছে তোর তো কষ্ট পাওয়ার কথা, তা না উল্টো তুই হাসছিস?
নীরব: প্ল্যান ছিল তো, রোমান্স চালিয়ে যা বাসায় ফিরে সব বলবো। (নীরব চোখ টিপ দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল)
আদিল: চলে যাচ্ছিলে যে আমাকে ছাড়া থাকতে পারতে?
আমি: কি করবো চব্বিশ ঘন্টা তো সেই দুপুরেই শেষ হয়ে গেছে।
আদিল: ওহ আমার এক বন্ধুর এক্সিডেন্ট হয়েছে ওকে নিয়ে হসপিটালে ছিলাম। তাড়াহুড়োর মাঝে ফোনটা কোথায় হারিয়ে গেছে তাই তোমাকে ফোন করতে পারিনি। (আদিল একহাতে আমার কোমড় জড়িয়ে ধরে রেখেছে অন্য হাতে আমার কপালে আসা চুল গুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে মুগ্ধ নয়নে)
আমি: তোমার মানহার কি হবে? (আদিল মুচকি হেসে আমাকে ছেড়ে বালুতে বসে পড়লো)
আমি: হাসছ যে? মানহা যদি...
আদিল: মানহা নামে কেউ নেই।
আমি: মানে? (আশ্চর্য হয়ে আদিলের সামনে এসে বসলাম)
আদিল: তোমাকে আমার থেকে দূরে রাখার জন্য মানহা নামটা ব্যবহার করেছিলাম কিন্তু দূরে রাখতে পারিনি তুমি ঠিক আমাকে কাছে টেনে নিলে।
আমি: তাহলে সেদিন যে কথা বললাম?
আদিল: ওইটা আমার কলিগ ছিল, অনেক রিকুয়েস্ট করে ওকে মানহা সাজিয়ে তোমার সাথে কথা বলিয়েছিলাম কারণ মানহা নামে আদৌ কেউ আছে কিনা এই সন্দেহটা তোমার মনে বাসা বেঁধেছিল।
আমি: কিন্তু কেন? শুধুমাত্র আমাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এতো গুলো মিথ্যে বলেছ?
আদিল: কি করবো তোমাকে তো আমি সেদিনই ভালোবেসে ফেলেছিলাম যেদিন তোমাকে প্রথম রেলস্টেশনে দেখেছিলাম। তোমার অজান্তে তোমার কিছু ছবি তুলেছিলাম আর সেগুলো আম্মুকে দেখিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করেছিলাম। বিয়ের দিন পর্যন্ত সব ঠিক ছিল কিন্তু বিয়ের দিন রাতে আম্মু সব উলটপালট করে দিল, তোমাকে ভালোবাসতে তোমার কাছে যেতে নিষেধ করলো। আমি নিরুপায় ছিলাম, ভালোবাসার মানুষ কাছে থাকা সত্ত্বেও ভালোবাসতে পারবো না তাকে ছুঁতে পারবো না, তাকে যে ভালোবাসি বলতে পারবো না এইটা ভাবতেই কষ্ট হতো। আমি ভিতরে ভিতরে যে কষ্ট পাচ্ছিলাম তুমিও সে কষ্ট পাবে এইটা আমি মানতে পারছিলাম না আর তাই তোমাকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি সত্যিকারের ভালোবাসার কাছে ব্যর্থ হয়েছি, আমাদের ভালোবাসা তো পবিত্র আমাদের আলাদা করার সাধ্য কার আছে?
আদিল দুহাতে আমার গাল ধরে আমার কপালে ওর কপাল ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আমি বোবার মতো চুপচাপ বসে আছি। আদিল আমাকে বিয়ের আগে থেকে ভালোবাসে অথচ আমি বুঝতে পারিনি? আদিল মনে মনে এতোটা কষ্ট পাচ্ছিল আর আমি বুঝতে পারিনি ওর কষ্টটা? শুধুমাত্র আমাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য আদিল মানহা নাম নিয়ে মিথ্যে বলেছে আর আমি বুঝতে পারিনি? আমি এতোটাই বোকা যে আদিলের চোখের ভাষা বুঝতে পারিনি, ওর ভালোবাসা বুঝতে পারিনি।
আদিলের দিকে তাকালাম এখনো কাঁদছে, ওর মাথাটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। এখন আদিল আমার পাশে আছে আমি সব সত্যি খুঁজে বের করবো আর সব সমস্যার সমাধান করবো। আদিল আর আমাকে মা কেন কেউ আলাদা করতে পারবে না। স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা যে বড় পবিত্র এই বন্ধন ছিন্ন করার সাধ্য কার আছে...

চলবে😍
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url