তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১০



রুমের এক কোণে দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ দুটু বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছি, আমার কপালে হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ করা। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে বড্ড ক্লান্ত লাগছে কিন্তু তবুও ঘুমাতে পারছি না ভয় হয় আদিল যদি আবার পাগলামি করে। আদিল বিছানায় উপুড় হয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে, নীরব সোফায় বসে ঝিমাচ্ছে। আমার চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এসেছিল, নীরব আমার হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে আমার পাশেই বসে ছিল আর বাকি সবাই ঘুমুতে গেছে। একটু আগের কথা মনে পড়লেই আমার গাঁ শিউরে উঠছে, কি থেকে কি হয়ে গেল। যে আদিল আমাকে কষ্ট দিয়ে নিজে কষ্ট পায় সে কিনা আজ আমাকে এতোটা কষ্ট দিলো?

ভোরবেলা বারান্দার চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছিলাম হঠাৎ কারো বমি করার শব্দে হকচকিয়ে উঠলাম, রুমের ভিতরে তাকালাম নীরব চলে গেছে আদিলও বিছানায় নেই তাহলে কি আদিল বমি করছে? ওয়াশরুম থেকে শব্দ আসছে শুনে দৌড়ে আসলাম। আদিল বমি করছে ওর চোখ লাল হয়ে গেছে।
আমি: আদিল কি হয়েছে?
আদিল: কিছুনা।
আমি: দাঁড়াও পানি দিচ্ছি। (পানি এনে দিতেই আদিল পুরো গ্লাসের পানি খেয়ে নিলো, চুলগুলো উসকোখুসকো চোখ দুটু লাল, এক দিনে কি অবস্থা করেছে নিজের)
আমি: আস্তে যাও পরে যাবে তো।
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: নিজে দোষ করে এখন আবার আমার উপর রেগে আছ। (আদিলকে ধরে ধরে বিছানায় এনে বসালাম ও ঠিক করে বসতেও পারছে না। শার্টে বমি লেগে আছে দেখে শার্ট আনতে আলমারির দিকে পা বাড়ালাম, পা নিয়ে হাটতে পারছি না)
আমি: শার্ট চেঞ্জ করে নাও।
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: আরে আজব মানুষ তো। (আমিই ওর শার্টের বোতাম খুলতে গেলাম কিন্তু হাতে ব্যান্ডেজ থাকায় পারছি না, এক হাতে কষ্ট করে বোতাম গুলো খুললাম)
আমি: হুম এবার চেঞ্জ করে নাও।
আদিল: আজ খালি বুক দেখে দুষ্টুমি করবে না? (আদিল শার্ট চেঞ্জ করতে করতে নিচের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো, আমি মৃদু হেসে বারান্দায় যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম তখনি পায়ে প্রচন্ড ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম)
আদিল: কি হয়েছে?
আমি: কিছুনা। (পায়ের দিকে তাকালাম ব্যান্ডেজ থাকা সত্ত্বেও রক্ত বের হচ্ছে, বারান্দা থেকে দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম এজন্য বোধহয়)
আদিল: দেখি।
আমি: আরে পায়ে হাত দিচ্ছ কেন?
আদিল: চুপ করে বসে থাকো।
আমি: (নিশ্চুপ)

আদিল আমার পাশে ফ্লোরে বসে ব্যান্ডেজ খুলে আবার ব্যান্ডেজ করে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে আমাকে কোলে তুলে নিলো।
আদিল: যে ছেলে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে তোমাকে এতো আঘাত করেছে তার জন্যই দৌড়ে গিয়ে পা থেকে আবার রক্ত ঝরিয়েছ, আচ্ছা আমি বমি করলে তোমার কি? কেন এভাবে দৌড়ে ছুটে এসেছিলে?
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: ঘুমিয়ে পড়ো, নেশা কেটে গেছে ভয় নেই আর মাতলামি করবো না।
আদিল আমাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে বারান্দায় চলে গেল, ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি আর আনমনেই হাসছি, আজব একটা মানুষ ওকে বুঝা সত্যি খুব কঠিন।

মিতু: ভাইয়া পাগলামির একটা লিমিট থাকা প্রয়োজন, মেয়েটার কি হাল করেছ দেখেছ? (রুমের বাইরে মিতুর চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে গেল, চারপাশে চোখ বুলালাম আদিল রুমে নেই)
আদিল: মিতু আস্তে ওর ঘুম ভেঙে যাবে এমনি সারারাত ঘুমায়নি। (ওহ আদিল বাইরে, ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম সকাল নয়টা বাজে। উঠে বসতে চাইলাম কিন্তু পা আর হাতের ব্যথায় পারছি না সাথে তো মাথা ব্যথা আছেই)
মিতু: কি করে ঘুমাবে রাতে কি কি করেছ মনে আছে তোমার? আচ্ছা ভাইয়া তুমি তো এর আগেও অনেকবার নেশা করেছ কিন্তু এতোটা তো কখনো করনি, কাল তোমার কি হয়েছিল?
আদিল: তুই তো সব জানিস, আমি না দুটানায় পরে গেছি তাই নিজের উপর রাগ করে কাল একটু বেশি...
মিতু: একটু বেশি নয় ভাইয়া অনেক বেশি খেয়েছ কাল, এতোটাই বেশি যে ভাঙা বোতল দিয়ে ভাবির হাত কেটে দিতেও কষ্ট হয়নি তোমার।
আদিল: কিন্তু এখন তো হচ্ছে।
মিতু: হবেই তো এখন তো আর নেশার ঘোরে নেই। আর এখন হলেই বা কি মেয়েটার শরীর থেকে যতোটুকু রক্ত ঝরেছে পারবে সেগুলো ফিরিয়ে দিতে? মেয়েটা ব্যথায় চিৎকার করে কেঁদেছে পারবে ওর কষ্ট ভুলিয়ে দিতে?
আদিল: পারবো না জানি কিন্তু এখন আমি কি করবো এইটা বল, আমি আনিশার চোখের দিকে লজ্জায় তাকাতে পারছি না।
মিতু: যে ভুল বুঝে অনুশোচনায় ভোগে তাকে সবাই ক্ষমা করে দেয়, তুমিও ভাবির কাছে ক্ষমা চাও।
আদিল: আমি ওর সামনে যেতে পারছি না কথা বলবো কিভাবে আর ও কি আমায় ক্ষমা করবে?
মিতু: ভাবি তোমাকে ভালোবাসে ভাইয়া এইটা তুমি বুঝনা? ভালোবাসা সব অন্যায় ক্ষমা করতে জানে।
আদিল: হুম।
মিতু: ভাইয়া মানছি ভাবিকে আমরা কষ্ট দিতে চাই কিন্তু মানসিক কষ্ট কখনোই দিতে চাইনি, ভাবি তোমার অবহেলায় তিলেতিলে কষ্ট পেয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আম্মুর কথা বাদ দাও তোমার মন যা বলে তাই শুনো, মনে রেখো ভালোবাসা সহজে পাওয়া যায় না। কে বলতে পারে তোমার অবহেলায় ভাবির মন একবার পাথর হয়ে গেলে আর হয়তো সে মনে ভালোবাসা জন্মাবে না। সময় থাকতে ভালোবাসার মর্ম বুঝো ভাইয়া, একবার হারিয়ে গেলে সে ভালোবাসা ফিরে পাওয়া খুব কষ্টকর।
আদিল: আমার মন যা চায় আম্মু তো তা চায় না।
মিতু: তাতে কি? একটা মেয়ের পক্ষে সব সম্ভব ভাইয়া, মেয়েরা জানে ভালোবাসা দিয়ে কি করে সবার মন জয় করে নিতে হয়। তুমি একবার ভাবিকে মেনে নাও দেখবে ভাবি আম্মুর মন ঠিক জয় করে নিবে।
আদিল: মানবে না কারণ আনিশা...
মিতু: অন্যায় তো মানুষই করে, ওকে নাহয় আমরা একটা সুযোগ দিবো।
আদিল: এইটা তুই বুঝছিস আমি বুঝছি কিন্তু আম্মুকে বুঝাবে কে?
মিতু: চেষ্টা তো করতে হবে।
আদিল: আম্মু মানবে না উল্টো ডিভোর্স এর সিদ্ধান্ত নিবে।
মিতু: আম্মু বললেই তুমি ডিভোর্স দিবে কেন? বিয়েটা তো তুমি করেছ আম্মু নয়, ভাবি খারাপ? হউক খারাপ, এই খারাপ মেয়েকে নিয়ে যদি তোমার সংসার করতে আপত্তি না থাকে তাহলে আম্মুর কিসের এতো আপত্তি?
আদিল: সব তো জানিসই।
মিতু: হুম জানি তারপরও বলবো আমরা যা করছি তা অন্যায়, অনেক হয়েছে এবার মেয়েটাকে ক্ষমা করে দেয়া প্রয়োজন।
আদিল: হুম।
মিতু: ভাইয়া মন যা বলে সেটাই শুনো আর ভাবিকে বলো আম্মুর কাছে যেন ক্ষমা চায়।
আদিল: ঠিক আছে।
সবকিছু নীরব হয়ে গেল, আদিল রুমে আসছে বুঝতে পেরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।

আমি ঘুমিয়ে আছি ভেবে আদিল এসে আমার মাথার পাশে বসে আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, হাতের ব্যান্ডেজে একটা চুমু খেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমি চুপচাপ শুয়ে আছি কি বলবো রাতে যা হয়েছে তারপর আর কিছু তো বলার নেই। হঠাৎ মনে হলো আদিল আমার পায়ের কাছে যাচ্ছে, চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি ও আমার পায়ের ব্যান্ডেজে চুমু খেতে যাচ্ছে।
আমি: এই কি করছ? (লাফ দিয়ে উঠে বসতে গিয়ে হাতে ব্যথা পেলাম, ওদিকে আমার চেঁচানো শুনে আদিল কেঁপে উঠে দূরে সরে গেল)
আমি: কি করতে যাচ্ছিলে?
আদিল: কিকিছু নানাততো।
আমি: তোতলাচ্ছ কেন?
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: একদম আমার কাছে আসার চেষ্টা করবে না।
আদিল: আনিশা তুমি যা ভাবছ তা নয় আমি এতোটাও খারাপ না।
আমি: তুমি কেমন সেটা রাতেই আমি প্রমাণ পেয়েছি।
আদিল: আনিশা প্লিজ! (আদিলের মুখের অবস্থা দেখে খুব হাসি পাচ্ছে কিন্তু হাসলাম না, আদিলের মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা বের করতে হলে আমাকে কঠোর থাকতে হবে)
আদিল: খাবে না?
আমি: চোরের মতো অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলছ কেন? তারমানে আমি যা আন্দাজ করেছি তা...
আদিল: আমি এতো খারাপ না প্লিজ খারাপ কিছু ভেবো না, আমিতো...
আমি: তুমিতো কি? (আদিল অসহায়ের মতো আমার চোখের দিকে তাকালো, ওর দুচোখে লজ্জা আর অনুশোচনা)
আদিল: নাশতা করবে চলো।
আমি: চোখে দেখছ না আমার পা কাটা হাত কাটা কপাল ফেটে গেছে? আমি কি করে হেটে যাবো?
আদিল: ওহ তাই তো, আচ্ছা তুমি বসো আমি আসছি।
আদিল চলে যেতেই ফিক করে হেসে দিলাম, ওকে তো এখন আমি নাচাবো। লুচু জামাই প্রতিশোধ নিচ্ছ? দেখি কতোটুকু প্রতিশোধ নিতে পারো। আমিও কথা দিচ্ছি আমার ভালোবাসার রঙে তোমাকে ঠিক রাঙাবো, তোমার মনের প্রতিশোধের আগুনে আমার ভালোবাসার আবীর মাখাবো তারপর দেখবো লুচু জামাই তুমি কি করে প্রতিশোধ নাও।

বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছি হঠাৎ আদিলের ফোন বেজে উঠলো, ফোন হাতে নিয়ে দেখি 'মানহা' বাব্বাহ্ পাগলী থেকে মানহা?
আমি: হ্যালো।
মানহা: আদিল কোথায়?
আমি: জাহান্নামের চৌরাস্তায়, যাবে তুমি?
মানহা: এভাবে কথা বলছ কেন? আদিল অফিসে আসবে না?
আমি: না আমি অসুস্থ তো তাই আমার সেবা করছে আজ যেতে পারবে না।
মানহা: ইদানীং ও অনেকদিন অফিসে আসেনি, চাকরিটাই না আবার চলে যায়।
আমি: তাতে তোমার কি? আদিল চাকরি না করলে আমি খেতে পরতে পারবো না তোমার তো কিছু না।
মানহা: মানে? দুদিন পর তো আদিলের বউ আমি হবো।
আমি: সেই স্বপ্ন ধুয়ে পানি খাও, আমি আদিলকে ডিভোর্স দিচ্ছি না কারণ আমি ওকে ভালোবাসি।
আদিল: কার সাথে কথা বলছ?
আমি: মানহা শাঁকচুন্নি। (আদিল জিহ্বায় কামড় দিয়ে ফোন কেড়ে নিয়ে কেটে দিল)
আদিল: আজ আমার কপালে দুঃখ আছে।
আমি: কেন?
আদিল: এইযে শাঁকচুন্নি ডাকলে, অফিসে যাওয়ার পর আমার বারোটা বাজাবে।
আমি: আচ্ছা মানহা কি তোমার কলিগ?
আদিল: হ্যাঁ।
আমি: তাহলে তোমার আর অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই চাকরিটা ছেড়ে দাও।
আদিল: মানে?
আমি: আদিল অনেক হয়েছে এবার অন্তত লুচুগিরী ছাড়ো।
আদিল: তুমি আবার আমাকে লুচু ডাকছ?
আমি: লুচুই তো তুমি, লুচু জামাই।
আদিল: খেয়ে নাও। (আদিল মুচকি হেসে আমার সামনে খাবারের প্লেট দিলো)
আমি: দেখতে পাচ্ছ না আমার হাত কাটা? কি করে খাবো?
আদিল: রাতের জন্য শাস্তি দিচ্ছ?
আমি: এইটাকে তোমার শাস্তি মনে হয়েছে? খাবোই না এই খাবার।
আদিল: আরে আমি সেভাবে বলিনি, ইসস আমি যে কি। শুনোনা...
আমি: বললাম তো খাবো না।
আদিল: প্লিজ রাগ করো না।
আমি: কান ধরো তাহলে রাগ করবো না।
আদিল: কি?
আমি: কান ধরে উঠবস করো।
আদিল: বেশি হয়ে গেল না?
আমি: ঠিক আছে আমি খাবো না।
আদিল: না না ধরছি। (আদিল কান ধরে উঠবস করছে আর দরজার দিকে বারবার তাকাচ্ছে, আমি গুণছি আর হেসে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছি)
আদিল: শান্তি তো এবার খেয়ে নাও।
আমি: ওকে।
আদিল আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে আমিও চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছি, এভাবেই আদিলের ভালোবাসা আমি জয় করে নিবো।

বারান্দায় চেয়ারে চুপচাপ বসে আছি আর ভাবছি কি করলে আদিল আমার ভালোবাসা বুঝবে, আমি ওকে ভালোবাসি সেটা তো কিছুতেই বুঝাতে পারছি না। হঠাৎ আদিল এসে সামনে দাঁড়ালো হাতে আমার ফোন।
আদিল: তোমার আব্বু... (আজ আব্বু আসবেন আমিতো ভুলেই বসে আছি, আব্বুকে নিষেধ করতে হবে তাড়াতাড়ি ফোন হাতে নিলাম)
আমি: আব্বু?
আব্বু: কেমন আছিস?
আমি: ভালো তোমরা কেমন আছ?
আব্বু: ভালো, আজ তোকে নিতে আসবো।
আমি: না না আজ এসো না।
আব্বু: কেন?
আমি: দুদিন পর আমিই যাবো আদিলকে নিয়ে।
আব্বু: ঠিক আছে।

ফোন রাখতেই আদিল আমার দিকে রাগি চোখে তাকালো।
আমি: কি?
আদিল: বিয়ের পর এই প্রথম উনি আমাদের বাসায় আসতে চাইলেন আর তুমি না করে দিলে?
আমি: জন্মের সময় আম্মুকে হারিয়েছি তো সেই ছোটবেলা থেকে আব্বু আগলে রেখে বড় করেছেন, আমি খেলতে গিয়ে যদি পরে গিয়ে ব্যথা পাই সেজন্য আব্বু অফিসে যেতেন না সারাক্ষণ আমার সাথে সাথে থাকতেন। কষ্ট কখনো আমাকে ছুঁতে পারেনি। আজ আব্বু এসে যদি আমার হাতে পায়ে কপালে ব্যান্ডেজ দেখতেন তাহলে অনেক কষ্ট পেতেন, হয়তো কিছু বুঝতে পারলে তোমার থেকে আমাকে দূরে নিয়ে যেতেন।
আদিল: সব আমার দোষ আমি... (আদিল চোখের পানি মুছতে মুছতে চলে গেল)

নীরব: রাতে যা করেছিস তুই তারপর আর তোর কাছে আনিশাকে রাখার ভরসা আমি পাচ্ছি না, আজ থেকে আনিশা মিতুর সাথে থাকবে। আর তুই খুব তাড়াতাড়ি ওকে ডিভোর্স দিবি।
আদিল: আমার বউ কোথায় থাকবে সেটা তুই ঠিক করবি?
নীরব: হ্যাঁ করবো কারণ আমি আনিশাকে ভালোবাসি। আর নির্লজ্জের মতো বউ বলিস কিভাবে? আনিশাকে সত্যি যদি বউ ভাবতি তাহলে রাতে ওকে এতো আঘাত করতি না, তুই তো আনিশাকে শত্রু ভাবিস।
আদিল: আমি আনিশাকে ডিভোর্স দিবো না।
মিতু: থামবে তোমরা? একটা মেয়েকে নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে এমন ঝগড়া ছিঃ!
আদিল: ঝগড়া তো ও করছে, আনিশা আমার স্ত্রী আমি আনিশার সাথে কেমন ব্যবহার করবো সেটা আমার ব্যাপার ও নাক গলানোর কে?
নীরব: তোর যা ইচ্ছা তাই আনিশার সাথে করতে পারিস না আমি করতে দিবো না, আমি আনিশাকে ভালোবাসি আমি ওকে আগলে রাখবো।
আদিল: তোর ভালোবাসা ছাড়াচ্ছি। (ওরা বাগানে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছে আর আমি বারান্দায় বসে দেখছি, এখন মনে হচ্ছে আর এখানে বসে থাকা যাবে না। আদিল নীরবের শার্টের কলার চেপে ধরেছে মিতু ছাড়াতে পারছে না)
মিতু: ভাইয়া কি হচ্ছে ছাড়ো বলছি।
আদিল: ওকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছিলাম আর আজ ও আমার স্ত্রীর দিকে নজর দিয়েছে।
নীরব: আবারো নির্লজ্জের মতো স্ত্রী বলছিস? স্ত্রী শব্দটার মানে বুঝিস তুই? তুই তো এই শব্দটাকেই সম্মান করতে জানিস না আনিশাকে কি সম্মান করবি আর ভালোবাসবি? আরে বিয়ে মানে তিনবার কবুল বলা আর একটা সিগনেচার করা নয়, ভালোবাসা দিয়ে আগলেও রাখতে হয়। তুই তো আনিশাকে ভালোই বাসিস না।
আদিল: (নিশ্চুপ)
ওদের ঝগড়া মায়ের কানে পৌঁছানোর আগেই থামাতে হবে, মা এসব শুনতে পারলে আমার উপর দিয়ে ঝড় যাবে।

নীরব: এইতো আনিশা এসেছে ওকেই জিজ্ঞেস কর ও কাকে ভালোবাসে।
আদিল: আনিশা তুমি এই পা নিয়ে হেটে এসেছ কেন আবার যদি রক্ত... (ঠাস করে আদিলের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলাম, নীরবের কাছে এসে ওর গালেও একটা থাপ্পড় দিলাম। এবার দুজনেই শান্ত হয়েছে, গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে)
মিতু: ভাবি...
আমি: মিতু ওদের থাপ্পড় দেওয়াটা প্রয়োজন ছিল, ওরা যা নাটক শুরু করেছে তাতে আমার সম্মান নষ্ট হচ্ছে। একবার যদি মা বুঝতে পারেন ওরা দুজনই আমাকে ভালোবাসে তাহলে কি হবে বুঝতে পারছ?
নীরব: আনিশা আদিল তোমাকে ভালোবাসে না।
আমি: একদম চুপ, কে আমাকে ভালোবাসে সেটা আমাকে বুঝতে দাও। দুজন আমাকে নিয়ে ঝগড়া শুরু করেছ একবারো জানতে চেয়েছ আমি কাকে ভালোবাসি? আদিল, যে মানুষটাকে প্রথম দেখায় ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তারপর বিয়ে হলো আর ওর প্রতি আমার ভালোবাসা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আদিল আমার উপর দিনের পর দিন মানসিক অত্যাচার করেছে তবুও আমি ওকে ভালোবেসেছি, শুধু আদিল নয় ওর পরিবারের সবাই আমার উপর অত্যাচার করেছে। আর গতকাল রাতে তো শুধু মানসিক নয় রীতিমতো আমার...
নীরব: আনিশা আমি তোমাকে স্পষ্ট ভাবে বলে দিচ্ছি আমি তোমাকে ভালোবাসি, তুমি আদিলকে ভালোবাস কিনা এসব শুনতে চাই না। আদিল তোমাকে ভালোবাসে না এটাই আমার কাছে যথেষ্ট।
আমি: আমাকে কি তোমাদের বাজারের মেয়ে মনে হয়? (আমার প্রশ্ন শুনে আদিল নীরব দুজনেই অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে)
আমি: আনিশা কোনো বাজারের মেয়ে নয় যে ইচ্ছে হলে ভালোবাসবে আবার ইচ্ছে হলে ছুড়ে ফেলে দিবে। আমাকে নিয়ে যদি আর তোমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে তাহলে কিন্ত...
আদিল তুমি যদি ভেবে থাকো আমার প্রতি প্রতিশোধ নিবে আর আমি মুখ বোজে সহ্য করবো তাহলে ভুল ভাবছ, ভালোবাসি তাই বলে অত্যাচার সহ্য করবো না। আমি তোমাকে চব্বিশ ঘন্টা সময় দিলাম ভাবো, ভেবে বলো আমাকে মেনে নিবে নাকি ডিভোর্স দিবে। মেনে নিলে ভালো নাহলে দুদিনের মধ্যে ডিভোর্স এর ব্যবস্থা করতে হবে আর তুমি যদি কোনো সিদ্ধান্ত না নাও তাহলে আমি আগামীকাল ঢাকা চলে যাবো আর ডিভোর্স পেপারে সাইন করে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিবো। মনে রেখো সময় মাত্র চব্বিশ ঘন্টা।
আদিল: আনিশা শুনো...
মিতু: ভাবি শুনো প্লিজ!
কারো ডাকে সাড়া দিলাম না, অনেক হয়েছে এবার সবকিছুর সমাধান হওয়া প্রয়োজন। ভালোবাসি বলে এখানে পরে থেকে অত্যাচার সহ্য করতে পারবো না ভালো দূর থেকেও বাসা যায়। আদিল যখন আমাকে ভালোবাসে না তখন আমি নাহয় ওকে দূর থেকেই ভালোবাসবো...

চলবে😍
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url