তবুও ভালোবাসি | পর্ব -০৯



আদিলের কাধে মাথা রেখে বালুচরে বসে আছি আর আনমনা হয়ে সমুদ্রের বুক ছিঁড়ে উঠা সূর্যোদয় দেখছি, আদিল একহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে আর অন্য হাতের মুঠোয় আমার একটা হাত নিয়ে খেলা করছে। ভোরবেলা খুব করে বায়না ধরেছিলাম সূর্যোদয় দেখবো বলে ব্যস আদিল নিয়ে আসলো সমুদ্রের পাড়ে। যে আমার সব আবদার পূরণ করে, যে আমাকে কষ্ট দিয়ে নিজেও কষ্ট পায় সে যে কেন আমাকে ভালোবাসি শব্দটা বলে না সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। আদিল আমাকে ভালোবাসে আমি বুঝতে পারি কিন্তু...
আদিল: এর আগে কখনো সূর্যোদয় দেখেছ?
আমি: হ্যাঁ আমিতো দুবার কক্সবাজার এসেছিলাম।
আদিল: ঘুরেবেড়ানো খুব বেশি পছন্দ করো?
আমি: হ্যাঁ অনেক জায়গা ঘুরেছি এখনো অনেক জায়গা বাকি আছে।
আদিল: সমস্যা কি ডিভোর্স এর পর আবার ঘুরবে।
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: মন খারাপ করেছ কেন আমিতো ফাজলামো করেছি। (আদিলের কথা শুনে মৃদু হাসলাম, হয়তো খুব শীঘ্রই আমরা আলাদা হয়ে যাবো)
আদিল: আমি মজা করেছি তুমি মুখ গোমড়া করে থেকো না প্লিজ! হাসো একটু। (আদিল আমার দুগালে হাত রেখে আমাকে হাসানোর চেষ্টা করছে দেখে আমিও মুখে হাসির রেখা টানার বৃথা চেষ্টা করলাম)
আদিল: এবার বাসায় চলো আম্মু বুঝতে পারলে রাগারাগি করবে।
আমি: রাগ করবে কেন?
আদিল: এইযে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি।
আমি: কেন তুমি কি তোমার বউকে নিয়ে একটু ঘুরতেও পারো না? সে স্বাধীনতা টুকুও কি তোমার নেই? আজব ছেলে তো তুমি, হ্যাঁ মানছি মায়ের সব কথা শুনা সব সন্তানের উচিত কিন্তু তাই বলে অন্যায়কেও প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নাকি? (আমার কথা শুনে আদিল মুচকি হাসলো)
আমি: হাসছ যে?
আদিল: একদিন জানতে পারবে আমি কেন আম্মুর সব কথা শুনি। সেদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করো, এবার চলো।
আদিল উঠে হাটা শুরু করলো, আমিও চুপচাপ ওর পিছু পিছু হাটছি।

মা: কোথায় গিয়েছিলে? (বাসায় ঢুকতে যাবো তখনই মা প্রশ্ন করলেন, আদিল তো ভয়ে শেষ)
আমি: মা আম...
আদিল: আনিশা চুপ থাকো। আম্মু একটু সমুদ্রের...
মা: আমাকে বলার প্রয়োজন মনে হয়নি তাই না?
আদিল: আসলে তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই ডাকিনি।
মা: আজ প্রথমবার তাই কিছু বললাম না, আর যেন কখনো এমন না হয়।
মা চলে গেলেন আদিলও রুমে চলে গেল। এই পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ কেমন যেন অদ্ভুত রকমের, ওদের বুঝা বড়ই কঠিন।

রুমে এসে দেখি আদিল ফ্রেশ হয়ে রেডি হচ্ছে অফিসে যাওয়ার জন্য। আমিও ফ্রেশ হতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম আদিল আমার হাত ধরে ফেললো, অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। আদিল আমার কাছে এসে আমার গালে একটা হাত রাখলো।
আদিল: আমি অফিসে চলে যাচ্ছি একদম দুষ্টুমি করবে না, কাল যা করেছ আজ তো অফিসে যেতেই ভয় হচ্ছে।
আমি: আমাকে কি তোমার ছোট বাচ্চা মনে হয়?
আদিল: অনেকটা তাই।
আমি: কি?
আদিল: প্লিজ কালকের মতো কিছু করো না তোমার জ্বর কিন্তু এখনো ভালো করে কমেনি।
আমি: ঠিক আছে।
আদিল: ফ্রেশ হয়ে নাশতা করে নাও আর ওষুধ খেও আমি আসছি।
আমি: নাশতা করবে না?
আদিল: বাইরে করে নিবো।
আমি: কেন মানহা বুঝি অপেক্ষা করছে? (আদিল চলে যাচ্ছিল আমার কথা শুনে পিছন ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে আবার চলে গেল, এই মানহা যে ওকে কি পাগল করেছে আল্লাহ্‌ জানেন)

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে আকাশ দেখছি আর মাঝেমাঝে কফির মগে চুমুক দিচ্ছি। হঠাৎ পিছনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পিছন ফিরে তাকালাম, নীরব এসেছে।
নীরব: কি করছ?
আমি: আকাশের তারা গুণছি।
নীরব: দিনের বেলায় তারা?
আমি: হ্যাঁ, কেন আপনি দেখতে পাচ্ছেন না?
নীরব: নাতো।
আমি: আসলে কারো প্রেমে পড়লে এসব অদ্ভুত ঘটনা গুলো ঘটে।
নীরব: বুঝলাম না।
আমি: আদিলের প্রেমে পড়েছি তো আমি তাই দিনের বেলা তারা দেখছি রাতের বেলা সূর্য দেখছি আর...
নীরব: ভালো জোকস করতে পারো তো তুমি। শুনো চাকরির ইন্টার্ভিউ দিতে যাচ্ছি দোয়া করো।
আমি: ইন্টার্ভিউ? কিন্তু আপনি তো শুনেছি বাহিরে পড়াশুনা করছেন। পড়াশোনা শেষ না করে হঠাৎ চাকরির সিদ্ধান্ত কেন?
নীরব: কারণ আমি আমার মনের মানুষকে পেয়ে গেছি আর তাকে নিয়ে এখানেই ছোট একটা সংসার সাজাতে চাই। (নীরব আমার কাছে এসে কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে কথাটা বললো)
আমি: বিয়ে করছেন নাকি?
নীরব: হুম করবো তার আগে প্রিয় মানুষটাকে নিজের করে পাই।
আমি: কেন সে জানে না আপনি যে তাকে ভালোবাসেন?
নীরব: জানে তো সেদিন বলেছিলাম কিন্তু পাত্তা দেয়নি উল্টো রাগ করেছিল। তবে আমিও নিরাশ হইনি রাগের পরেই তো ভালোবাসা হয়।
নীরব মুচকি হেসে চলে গেল। কিসব বলে গেল পাগলের মতো, আচ্ছা নীরব কোনো ভাবে আমাকে মিন করে কথাগুলো বলেনি তো? ধ্যাত বললে বলেছে তাতে আমার কি?

দুপুরের রান্না শেষ করে গোসল করে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম বড্ড ক্লান্ত লাগছে। পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে আব্বুকে ফোন করলাম।
আমি: হ্যালো।
ফুফু: আনিশা কেমন আছিস?
আমি: ভালো তুমি কেমন আছ?
ফুফু: তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে কাল ভাইয়া তোকে আনতে যাবে।
আমি: আব্বু নিতে আসবে? (মা'কে তো আগে বলা হয়নি মা যদি রাজি না হন? আব্বুকেই বা কি বলি)
ফুফু: কিরে চুপ হয়ে গেলি যে?
আমি: এমনি, আব্বু কোথায়?
ফুফু: একটু বাইরে গেছে।
আমি: ঠিক আছে আমি পরে ফোন করবো।
ফুফু: আচ্ছা। (ফোন রাখতেই দেখি আদিল অনেক বার ফোন করেছিল, আমি ব্যাক করতে যাবো তখনি আবার ফোন বেজে উঠলো)
আমি: হ্য...
আদিল: কার সাথে কথা বলছিলে? (আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই আদিল রাগি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো)
আমি: এতো রেগে আছ কেন আমি ফুফুর সাথে কথা বলছিলাম।
আদিল: ওহ!
আমি: কেন তুমি কি ভেবেছিলে বয়ফ্রেন্ডের সাথে...
আদিল: সেটা যে তোমার নেই আমি ভালো করেই জানি।
আমি: নেই কিন্তু হতে কতোক্ষণ?
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: কি হলো চুপ হয়ে আছ যে?
আদিল: খেয়েছ?
আমি: উঁহু তুমি খেয়েছ?
আদিল: খেয়ে নাও আর ওষুধ খেও রাখছি।
আমি: শুনো...
ধ্যাত কেটে দিলো, কিন্তু এতো রেগে গেল কেন?

পরন্ত বিকেলে বাগানে দোলনায় বসে আছি চুপচাপ হয়ে আর ভাবছি এভাবে তো চলতে পারেনা, আদিল তো ইচ্ছে করে আমার জীবন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবে চললে সত্যিই আমার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, এর কোনো একটা সমাধান প্রয়োজন। আমি বেশ বুঝতে পারছি ওরা আদিলের প্রতি আমার ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে আমাকে মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছে, এভাবে চললে আমি তিলেতিলে শেষ হয়ে যাবো। সবাই চেয়েছিল আমাকে বউ করে এনে অত্যাচার করে প্রতিশোধ নিবে কিন্তু ওরা এইটা না করে আমার উপর মানসিক অত্যাচার করছে। এসব তো চলতে পারেনা আমার জীবন সত্যি অনিশ্চয়তার দিকে চলে যাচ্ছে। যেভাবেই হউক আদিলকে বুঝাতে হবে, হয় ও আমাকে মেনে নিবে নয়তো খুব শীঘ্রই ডিভোর্স দিবে।
নীরব: আনিশা... (হঠাৎ নীরবের ডাকে কেঁপে উঠে সামনে তাকালাম, নীরব কখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি)
নীরব: কি ব্যাপার এতো অন্যমনস্ক হয়ে কি ভাবছিলে?
আমি: কিছুনা।
নীরব: কিছু তো একটা অবশ্যই ভাবছিলে।
আমি: ভাবছি আদিলের সাথে সরাসরি কথা বলবো, হয় আমাকে আদিল মেনে নিবে নয়তো ডিভোর্স দিবে। এভাবে আমি আর পারছি না, সত্যি তো বেশি দিন লুকানো থাকে না হুট করে আব্বু এসব জেনে গেলে অনেক খারাপ কিছু হবে আর তখন কিছুই করার থাকবে না।
নীরব: আনিশা আমি তোমাকে ভালোবাসি, আদিল তোমাকে ডিভোর্স দিলে পর আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
আমি: এসব কি বলছেন?
নীরব: সত্যি বলছি আমি তোমাকে ভালোবাসি।
আমি: সেদিন আমি কথাটায় বেশি গুরুত্ব দেইনি কারণ আমি ভেবেছিলাম আপনি ফাজলামো করছেন কিন্তু...
নীরব: ভালোবাসা নিয়ে কেউ ফাজলামো করে না আনিশা, ভালোবাসা ফাজলামো করার মতো কোনো বিষয় নয়।
আমি: মানছি ফাজলামোর বিষয় না আর আপনিও ফাজলামো করছেন না কিন্তু আপনি যা বলছেন সেটা অন্যায়।
নীরব: অন্যায় কেন হবে? কাউকে ভালোবাসা কি অন্যায়?
আমি: ভালোবাসা অন্যায় নয় তবে ভুল মানুষকে ভালোবাসা অন্যায়।
নীরব: আমিতো ভুল মানুষকে ভালোবাসিনি।
আমি: আপনি ভুল মানুষকেই ভালোবেসেছেন, আমি আদিলের স্ত্রী আর অন্য কারো স্ত্রীকে ভালোবাসা অন্যায়।
নীরব: আনিশা তোমাদের বিয়েটা তো...
আদিল: বাহ্ প্রেম তো ভালোই জমেছে। (নীরবের পিছন থেকে আদিলের কন্ঠ ভেসে এসেছে শুনে চমকে উঠলাম, এখন আদিল কোথা থেকে আসলো?)
আদিল: এসেছিলাম তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবো ভেবে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল সময় এসে পড়েছি।
নীরব: তুই যাবি আনিশাকে নিয়ে ঘুরতে? কোন অধিকারে যাবি, ভালোবাসার? নাকি শুধুই কাগজে কলমে...
আদিল: নীরব তুই কিন্তু ভুল করছিস।
নীরব: কাউকে ভালোবাসা যদি ভুল হয় তাহলে আমি ভুল করছি তাতে তোর কি?
আদিল: নীরব ও আমার স্ত্রী হয়।
নীরব: হ্যাঁ স্ত্রী তবে সেটা শুধু কাগজে কলমে, তোদের প্রতিশোধের নেশা মিটে গেলে ওকে তুই ডিভোর্স দিবি আমি জানি আর তখন আমি ওকে বিয়ে করবো।
আদিল: নীরব?
নীরব: চিৎকার করছিস কেন? তুই ভালোবাসিস না যখন তাহলে আমি ভালোবাসলে দোষ কোথায়?
আদিল: তুই কিন্তু একটা মেয়ের জন্য আমাদের বন্ধুত্বে...
মিতু: ভাইয়া... (চুপচাপ দাঁড়িয়ে ওদের দুজনের নাটক দেখছিলাম হঠাৎ মিতু দৌড়ে এসে হাঁপাতে শুরু করলো)
আদিল: কি হয়েছে?
মিতু: ফোন এসেছিল, আবার... (মিতু ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো, আদিল আর নীরব দুজন দুজনের দিকে একবার তাকিয়ে একসাথে দৌড়ে চলে গেল। কিন্তু ওরা দুজন এভাবে কোথায় গেল আর কে ফোন করেছিল?)
আমি: মিতু কে ফোন করেছিল আর ওরা দুজন এভাবে দৌড়ে কোথায় গেল?
মিতু: (নিশ্চুপ)
আমি: মিতু কথা বলছ না কেন?
মিতু আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চুপচাপ চলে গেল, আশ্চর্য তো।

রাতের আকাশে মেঘ জমেছে চারপাশ যেন গভীর অন্ধকারে ছেয়ে গেছে, চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আছে। দূর থেকে কিছু ঝিঝি পোকার ডাক শুধু ভেসে আসছে। বড্ড ভয় করছে আজ সবকিছু কেমন যেন শান্ত লাগছে, বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে আছি। দাদু সন্ধ্যার পর রুম থেকে বের হননি, মিতু আজ টিভি দেখেনি সন্ধ্যা থেকেই ওর রুমের লাইট অফ আর রান্না করার সময় মা'কে দেখেছিলাম ড্রয়িংরুমে বসে আঁচলে চোখ মুছছেন। রাত এগারোটা বেজে গেল নীরব আদিল এখনো ফেরেনি কোথায় গেছে তাও বুঝতে পারছি না, ওদিকে সবাইকে খেতে ডাকলাম কিন্তু কেউ আমার ডাকে সাড়া দিলো না। আদিলকে অনেক বার ফোন করেছি কিন্তু রিসিভ করেনি টেনশন হচ্ছে খুব।

রাত বারোটা বাজে এখনো কেউ খায়নি, মা'কে জোড় করার সাহস আমার নেই। কিন্তু দাদুকে তো খাওয়াতে হবে, বুড়ো মানুষ না খেয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বে তাই খাবার নিয়ে দাদুর রুমে আসলাম।
আমি: দাদু প্লিজ খেয়ে নিন, না খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন তো। (আমাকে দেখে দাদু আস্তে আস্তে উঠে বিছানায় বসলেন)
আমি: আমি জানিনা আজ সবার কি হয়েছে কিন্তু আপনি তো বুড়ো মানুষ, নিজের খেয়াল তো আপনাকে রাখতে হবে।
দাদু: আর খেয়াল এখন মরতে পারলেই বাঁচি।
আমি: দাদু এসব কি ধরণের কথা? (আমার ধমক শুনে দাদু আমার চোখের দিকে তাকালেন উনার দুচোখে পানি)
আমি: দাদু প্লিজ খেয়ে নিন।
দাদু: আদিলটা এখনো ফেরেনি তাই না?
আমি: কোথায় গেছে ওরা সেটাই তো আমি জানিনা।
দাদু: আজ আদিল ফিরে এসে অনেক পাগলামি করবে তুই কিন্তু বাঁধা দিস না একটু সহ্য করে নিস।
আমি: পাগলামি করবে মানে? (কলিংবেল বেজে উঠলো, দৌড়ে দরজা খুলতে গেলাম)

দরজা খুলে বোবার মতো দাঁড়িয়ে আছি, নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। বিয়ের পর যে ছেলের হাতে কখনো সিগারেট দেখিনি তার হাতে আজ মদের বোতল?
নীরব: সরো ওকে রুমে নিয়ে যেতে হবে।
আমি: ও নেশা করেছে কেন?
নীরব: (নিশ্চুপ)
আমি: আগে তো কখনো ওকে সিগারেট পর্যন্ত খেতে দেখিনি আজ হঠাৎ...
নীরব: পরে বলছি সব আগে ওকে রুমে নিয়ে যেতে দাও ও তো দাঁড়াতে পারছে না। (সরে দাঁড়ালাম, নীরব আদিলকে ধরে ধরে রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আর আদিল এলোমেলো পায়ে হাটছে আর কিসব বিড়বিড় করছে। দরজা বন্ধ করে দৌড়ে দাদুর রুমে আসলাম)
আমি: দাদু আদিল নেশা করেছে কেন? (দাদু আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপচাপ খাচ্ছেন)
আমি: দাদু বলছেন না কেন? এর আগে কি ও এমন করেছে কখনো?
দাদু: হুম মাঝেমাঝে করে।
আমি: যে ছেলে সিগারেট খায় না সে...
দাদু: মাঝেমাঝে কষ্ট ভুলার জন্য খেতে হয়।
আমি: কিসের কষ্ট?
দাদু: যা আদিলকে গিয়ে সামলা।
দাদুকে আর কিছু না বলে রুমের দিকে চলে আসলাম।

নীরব আদিলকে রুমে দিয়ে চলে গেছে আর আদিল বিছানায় শুয়ে মদ খাচ্ছে আর মাঝেমাঝে হাসছে। নেশা তো ভালোই হয়েছে তার উপর আরো মদ খাচ্ছে অসহ্য।
আমি: আদিল বোতলটা দাও আমার কাছে। (আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল)
আদিল: তুমি খাবে? এসো আমি খাইয়ে দেই।
আমি: একদম চুপ মাতাল কোথাকার। (বোতল কেড়ে আনতে চাইলাম কিন্তু আদিল উঠে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ফেললো, মদের গন্ধে আমার তো বমি আসার অবস্থা)
আদিল: সব তোর জন্য হয়েছে তুই খুব খারাপ মেয়ে। (আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো, আমি তাল সামলাতে না পেরে ফ্লোরে উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। কপালে হাত দিয়ে দেখি অনেকটা জায়গা কেটে গেছে রক্ত বের হচ্ছে)
আদিল: তোকে বিয়ে করলে আমার এতো কষ্ট পেতে হবে জানলে বিয়েই করতাম না শালা। আম্মু আমার সাথে বেঈমানি করেছে, নিজের পেটের ছেলে হলে পারতো না এমন করতে। (আদিলের কথা শুনে চমকে উঠলাম, নিজের পেটের ছেলে নয় মানে? তাহলে কি উনি সৎ মা? নাকি আদিল নেশার ঘোরে উল্টাপাল্টা বকছে?)
আদিল: এদিকে আয়। (কপালে হাত দিয়ে ফ্লোরে বসে ছিলাম, আদিল ডাক দেওয়াতে ওর পাশে এসে বিছানায় বসলাম)
আদিল: চল দুজন একসাথে সুইসাইড করি।
আমি: মানে? (আদিল হাসতে হাসতে মদের বোতলটা ভেঙে ফেললো)
আদিল: এই ভাঙা বোতল দিয়ে দুজন মরবো কেমন? (আদিল ভাঙা বোতল আমার গলার কাছে ধরে রেখেছে আমিতো সরে যেতেও পারছি না নড়লেই গলায় লেগে যাবে)
আমি: আদিল ছাড়ো প্লিজ আমি কিন্তু দাদুকে আর নীরবকে ডাকবো।
আদিল: নীরবকে ডাকবি কেন ও তোর কে হয়? প্রেম করিস নীরবের সাথে?
আমি: আহ... (আদিল ভাঙা বোতল দিয়ে আমার হাত কেটে দিল)
আমি: পাগল হয়ে গেছ তুমি কি করছ এসব?
আদিল: হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি, আজ তোকে খুন করে আমার সব দুটানার অবসান ঘটাবো। (আদিল আমার চুলে মুঠো করে ধরে ভাঙা বোতল আমার সামনে ধরে আছে, একদিকে কপাল থেকে রক্ত ঝরছে অন্যদিকে হাত থেকে রক্ত ঝরছে। এই কি সেই আদিল যে সকালে আমার গালে হাত রেখে দুষ্টুমি করতে নিষেধ করেছিল? আমার জ্বর কমেনি বলে অফিসে যেতে ভয় পাচ্ছিল?)
আদিল: আমার চোখের সামনে থাকলে তোকে আমি সত্যি খুন করবো যা এই রুম থেকে।
পালানোর জন্য তাড়াতাড়ি বোতল সড়াতে গিয়ে হাতে লেগে গেল, কোনোভাবে আদিলের হাত সড়িয়ে দিয়ে দৌড় দিলাম কিন্তু ফ্লোরে যে ভাঙা বোতলের কাঁচের টোকরো ছিল মনেই ছিলনা। দুটু কাঁচের টোকরো পায়ে গেঁথে গেছে, চিৎকার দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লাম। হাত থেকে পা থেকে রক্ত পড়ে ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে, কপাল থেকেও রক্ত ঝরছে আর আদিল আমার এই অবস্থা দেখে পাগলের মতো হাসছে। আচ্ছা আদিল কি সত্যি নেশার ঘোরে এমন করছে? নাকি আমার উপর অত্যাচার করার জন্য নেশা করার নাটক করছে...

চলবে😍

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url