তবুও ভালোবাসি | পর্ব -০৮



জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে আকাশ দেখছি আর একটা একটা করে ওষুধ জানালা দিয়ে বাইরে ফেলছি, প্রয়োজন নেই এসব ওষুধের। আমার উপর অত্যাচার করবে আমার ভালোবাসা নিয়ে খেলা করবে আবার সহানুভূতি দেখিয়ে নিজের হাতে আমাকে ওষুধ খাইয়ে দিবে। আনিশার কারো সহানুভূতির প্রয়োজন নেই আনিশা একাই বাঁচতে জানে। কেন যে এই লুচুটাকে বিয়ে করতে গেছিলাম, আমার জীবনটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সব দোষ আব্বুর কোনো খুঁজ খবর না নিয়ে ছেলে পছন্দ হতেই বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, অবশ্য আমারো দোষ কম নয় আদিলকে প্রথম দেখায় ভালো লেগেছিল বলে বিয়েতে অমত করিনি। আগের বার তো বিয়ে করবো না বলে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনের পালিয়ে যাওয়ার কথা মনে হতেই মনে একটা প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা এমন নয় তো এই পরিবারের সাথে ছেলেটির কোনো সম্পর্ক আছে আর আমি বিয়ে ভেঙে দেওয়াতে তাদের মানহানি হয়েছে যার প্রতিশোধ ওরা আমাকে এ বাড়ির বউ করে এনে নিচ্ছে? হতেই তো পারে এমন, কিন্তু এই বাসায় তো সেই ছেলেটিকে বা তার পরিবারের কাউকে কখনো আসতে দেখিনি বা কোনো ছবিও তো এই বাসায় নেই। আচ্ছা যদি এটাই কারণ হবে তাহলে সামান্য একটা বিষয়ের জন্য এতো অত্যাচার? একটা মানুষ বিয়েতে রাজি না'ই হতে পারে, সবার ভাবনা চিন্তা যে এক তাতো নয়। আমিতো ভাবতাম বিয়ে মানেই পরাধীনতার শিখলে নিজেকে বেঁধে ফেলা আর এই ভাবনা থেকেই বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমার ভুল একটাই বিয়ে ঠিক হবার আগে ভেঙে দেইনি কিন্তু তাই বলে এভাবে প্রতিশোধ নিবে?
মিতু: ভাবি দরজা খুলো। (মিতুর ডাকে ভাবনায় ছ্যাদ পড়লো, ঝটকা দিয়ে নীরবের হাত ছাড়িয়ে দিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে রুমে এসে দরজা বন্ধ করে রেখেছিলাম। মিতুর ডাকে দরজা খুললাম)
মিতু: চলো দুপুরের রান্না করবে। (মিতুর কথা শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল)
মিতু: এতো অবাক হওয়ার মতো কিছু হয়নি আমার সামনে পরীক্ষা তাই বাসার সব কাজ এখন থেকে তুমিই করবে।
আমি: কাজ নাহয় করবো কিন্তু পরীক্ষার দোহাই দিচ্ছ কেন? তুমি আবার পড়োও নাকি? শুনেছি তো এসএসসিতে টেনেটুনে পাস করে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছ। তাছাড়া বাসার কাজ তো তুমি করোনা সারাদিন সিরিয়াল নিয়ে পড়ে থাকো, কাজ সব মা আর বুয়া করে।
মিতু: এই মেয়ে রান্না করতে বলেছি বলে এতো কথা শুনাচ্ছ কেন? আর আমার পড়া নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।
আমি: ভাবতে হবে ননদিনী, আমি রান্না করে যখন খাওয়াবো তখন ভালো রেজাল্ট করতে হবে নাহলে খাবার বন্ধ।
মিতু: এতো বড় সাহস? আম্মুকে ডাকবো?
আমি: ডাকো।
মিতু: তাড়াতাড়ি এসে রান্না করো।
আমি: কিন্তু খাবারে যদি বিষ মিশিয়ে দেই? (মিতু রেগে চলে যাচ্ছিল আমার প্রশ্ন শুনে পিছন ফিরে তাকালো)
মিতু: আমি বুঝে গেছি তুমি এই বাসার সবাইকে ভালোবেসে ফেলেছ তাই বিষ তো দূরে থাক তুমি কাউকে কষ্টও দিবে না। (মিতু মৃদু হেসে চলে গেল। না মেয়েটাকে যতো খারাপ ভাবি ততোটাও খারাপ নয় শুধু পড়ায় ঢেড়স আর সিরিয়াল দেখে দেখে ঝগড়া শিখেছে)

আমি রান্না করছি আর বুয়া সবকিছু এগিয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ  দরজায় চোখ পড়লো, দাদু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার রান্না দেখছেন।
আমি: দাদু আপনি?
দাদু: এতো বড় বাড়ির মেয়ে রান্নাও পারে?
আমি: রান্নার দিকটা ফুফু সামলান তাই কখনো রান্না করতে হয়নি, তবে সখের বশে অনেক রান্না শিখেছি আর মাঝেমাঝে ট্রাইও করেছি।
দাদু: তোর হাতের রান্নায় জাদু আছে, এখন থেকে রোজ তুই রান্না করবি।
আমি: আমিতো রাঁধতে চাই দাদু কিন্তু মা যে আমার রান্না করা খাবার খান না, উনি তো ভাবেন আমি খাবারে বিষ মিশিয়ে দিবো। গতকাল রান্না করেছিলাম কই উনি তো সে খাবার মুখেও তুলে দেখেননি।
দাদু: মন খারাপ করিস না, শুধু একবার জোড় করে খাইয়ে দিস দেখবি তোর রান্নার স্বাদ আর ভুলতে পারবে না। (দাদু হাসতে হাসতে চলে গেলেন)
বুয়া: নতুন বউ তুমি এবার রুমে যাও বাকি গুলান আমি রানতে পারুম।
আমি: আমিই শেষ করে যাই সমস্যা নেই।
বুয়া: তোমার গায়ে তো জ্বর, পরে যদি কিছু হয়?
আমি: হবে না ভয় পেয়ো না।

গোসল করে রুমে আসতেই শরীর বেশ দূর্বল লাগলো, বিছানায় চুপচাপ শুয়ে রইলাম। চোখ দুটু একটু বোজে আসছিল হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার গায়ে বিছানা টেনে দিচ্ছে। চোখ খুলে তাকিয়ে নীরবকে দেখে চমকে গেলাম।
নীরব: আরে উঠো না, এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম রুমের ভিতর নজর পড়তেই দেখলাম তুমি গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছ। জ্বর এসেছে ভেবে বিছানা দিয়ে দিচ্ছিলাম।
আমি: না আমি ঠিক আছি।
নীরব: ওষুধ খেয়েছ? ওহ সরি তুমি তো এখনো খাবারই খাওনি, সবার জন্য খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে চলে আসলে যে তুমি খাবে না?
আমি: না ভালো লাগছে না।
নীরব: কেন আবার জ্বর...
আমি: প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দিন।
নীরব: ওকে ওকে চলে যাচ্ছি আমি।
নীরব চলে যেতেই বিছানাটা টেনে গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

কপালে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুম ভেঙে গেল, স্পর্শটা এখন চেনা হয়ে গেছে তাই আর চোখ খুলে তাকালাম না চুপচাপ শুয়েই রইলাম। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ কপালে জলপট্টি দেওয়াতে কেঁপে উঠে আদিলের দিকে তাকালাম।
আদিল: ওষুধ বোধহয় খাওনি তাই জ্বর এতোটা বেড়েছে। (জলপট্টি ছুড়ে ফ্লোরে ফেলে দিলাম)
আমি: আমার জ্বর হউক বা আমি মরে যাই তাতে আপনার কি? সহানুভূতি দেখাচ্ছেন? প্রয়োজন নেই এমন চরিত্রহীন লোকের সহানুভূতি। আবার যদি আমার...(আমার কথা শেষ হবার আগেই আদিল উঠে টেবিলের কাছে গেল, কি যেন খুঁজছে)
আদিল: ওষুধ কোথায় রেখেছ?
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: আমার উপরে রাগ করেছ শাস্তি দিলে আমাকে দাও নিজেকে কেন শাস্তি দিচ্ছ?
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: ওষুধ গুলো কোথায় রেখেছ বলো।
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি উত্তর দিচ্ছ না কেন?
আমি: ওষুধ জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছি। (আদিলের রাগে রক্তবর্ণ হয়ে যাওয়া চোখ দুটু দেখে আর ধমক শুনে গড়গড় করে বলে দিলাম। আদিল আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে)
আদিল: তুমি কি বাচ্চা মেয়ে যে অভিমান করে ওষুধ ফেলে দিয়েছ? নিজের শরীর নিয়ে চিন্তা নেই? জ্বর এতোটা বেড়েছে যে এখন কি খাবে?
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: এই কথাটা আম্মু জানলে কি হবে বুঝতে পারছ? আর এই বৃষ্টির মধ্যে আমি কোথা থেকে ওষুধ আনবো এখন? (ওর কথা শুনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, আমিতো এতোক্ষণ খেয়ালই করিনি। ইসস জ্বর নাহলে আজ ইচ্ছেমতো ভেজা যেতো)
আদিল: ধ্যাত তুমি যে কি করোনা।
আমি: আমাকে নিয়ে এতো ভাবতে কে বলেছে? আমাকে নিয়ে কারো ভাবতে হবে না। (আদিল চলে যাচ্ছিল আমার কথা শুনে পিছন ফিরে রাগি চোখে তাকালো, ও যেমন ওর চোখ দুটুও তেমন)

বাগানের মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজছি, চোখ দুটু বোজে বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটার স্পর্শ অনুভব করছি। হঠাৎ আমার হাত ধরে কে যেন হ্যাচকা টান দিলো, চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি আদিল ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আদিল খুব রেগে গেছে ওর চোখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কিন্তু ও হুট করে আসলো কোথা থেকে? আদিল বাসায় নেই নীরবও বাসায় নেই, মিতু টিভি দেখছে মা আর দাদু ঘুমাচ্ছেন দেখে তাইতো ভিজতে এসেছিলাম, হুট করে আদিল চলে আসবে বুঝতেই পারিনি।
আদিল: রুমে চলো।
আমি: আর একটু ভি... (আমার কথা শেষ হবার আগেই ঠাস ঠাস করে আমার দুগালে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে আছি)
আদিল: চলো রুমে চলো।

আদিল আমাকে টানতে টানতে রুমে নিয়ে এসে বাতরুমের ভিতর ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিলো। আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
আদিল: এই নাও শাড়ি, দু মিনিটের মধ্যে চেঞ্জ করে আসো। (আমার উপর শাড়ি ছুড়ে দিয়ে চলে গেল। কচু চেঞ্জ করবো এতো জোড়ে কেউ থাপ্পড় দেয়?)

বিছানায় গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছি, গাল দুটু খুব জ্বলছে। মানুষ মানুষকে এভাবে থাপ্পড় দেয় ভাবতেও পারছি না। গেল কোথায় লুচুটা? অনেক্ষণ হয়ে গেল দেখছি না। আমি ওর কথা ভাবতে ভাবতেই হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে রুমে ঢুকলো।
আদিল: মিতু বললো দুপুরে খাওনি এখন চুপচাপ খেয়ে নাও। (ওর কন্ঠ কেমন যেন শুনাচ্ছে ও কি কেঁদেছে?)
আমি: সন্ধ্যার সময় কিসের খাওয়া? আর অফিস রেখে এসে আমার সেবা করতে কে বলেছে?
আদিল: অফিসে ভালো লাগছিল না তাই চলে এসেছি তোমার সেবা করার জন্য আসিনি, চুপচাপ খেয়ে নাও। (আদিল আমার কাছে আসতেই ওর চোখের দিকে নজর পড়লো, বেশি কান্না করলে চোখ যেমন লাল হয়ে যায় ওর চোখ দুটু তেমনই লাল হয়ে আছে। তাহলে কি আদিল সত্যিই কান্না করেছে? কিন্তু কেন করেছে?)
আদিল: এইযে ওষুধ, খাবার খেয়ে ওষুধ খেয়ে নাও। আর হ্যাঁ এই ওষুধ গুলো ফেলে দিলে আমি কিন্তু আর বৃষ্টিতে ভিজে এনে দিবো না, ভুলে যেওনা বাসা থেকে দোকানপাট অনেক দূর।
আদিল চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেল, ও কান্না করছে দেখে ওকে আর জ্বালাতে ইচ্ছে হলো না তাই চুপচাপ খেতে শুরু করলাম। খাবার গরম দেখে আশ্চর্য হলাম, তবে কি আদিল খাবারগুলো গরম করে এনেছে? কিন্তু কেন? আচ্ছা আদিল বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে এতো দূর থেকে আমার জন্য ওষুধ আনলো কেন? প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না, চুপচাপ খেয়ে নিলাম।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে চারদিক একটু একটু করে অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে, এখনো ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি আর ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করছি। হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে আমার গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে দিলো, পিছন ফিরে তাকালাম আদিল আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আদিল: ঠান্ডা বাতাস বইছে এমনিতে জ্বরটা অনেক বেড়ে গে...
আমি: কেন করছ এসব?
আদিল: বড় হয়েছ এখন বাচ্চামি স্বভাব গুলো ছাড়ো, কি প্রয়োজন ছিল জ্বর গায়ে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজার। (আমার বাচ্চামি স্বভাব ছাড়ানো হচ্ছে? দাঁড়াও আর একটু জ্বালাই)
আমি: আইসক্রিম খাবো।
আদিল: কি?
আমি: কানে কম শুনো নাকি?
আদিল: আরো কয়েকটা থাপ্পড় খেতে ইচ্ছে করছে তাই না? (আদিলকে কিছু বলতে যাবো তখনই আমার ফোন বেজে উঠলো, রুমে চলে আসলাম)

ফোন হাতে নিয়ে দেখি আব্বু ফোন দিয়েছেন।
আমি: আব্বু...
আব্বু: জ্বর কমেছে?
আমি: হ্যাঁ।
আব্বু: মিথ্যে বলছিস নাতো? তোর তো আবার বৃষ্টি দেখলেই ভিজতে ইচ্ছে হয়।
আমি: আচ্ছা আব্বু আমি কি সত্যি বড় হয়ে গেছি?
আব্বু: না না তুই সেই পিচ্ছি আনিশাই রয়ে গেছিস কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন করলি কেন? (আব্বুর হাসি শুনে রাগ আরো বেড়ে গেল)
আমি: বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করছিলাম হঠাৎ আদিল আমার গায়ে চাদর জড়িয়ে দিয়ে বললো বড় হয়েছি বাচ্চামি স্বভাব গুলো যেন ছেড়ে দেই।
আব্বু: ছেলেটা তাহলে সত্যি তোকে ভালোবাসে যাক শুনে শান্তি পেলাম।
আমি: এইটাকে ভালোবাসা বলে?
আব্বু: হ্যাঁ শুধু ভালোবাসা নয় সত্যিকারের ভালোবাসা। (আব্বুর কথা শুনে বারান্দায় তাকালাম আদিল রেলিং ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে)
আব্বু: আচ্ছা রাখছি এখন ঠিকমতো ওষুধ খাবি কিন্তু।
আমি: হুম।
ফোন রেখে আদিলের দিকে তাকিয়ে আছি এক দৃষ্টিতে, এতোই যখন ভালোবাসে তাহলে কষ্ট দিচ্ছে কেন আমায়?

ড্রয়িংরুমে বসে পত্রিকা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছি হঠাৎ নীরবের রুমের দিকে চোখ পড়লো, নীরব দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে নজর দিলাম মা আর বুয়া রান্না করছে। আমি রান্না করতে এসেছিলাম কিন্তু জ্বরটা একটু বেশি বলে মা রান্না করতে দেননি। আবার নীরবের দিকে চোখ পড়লো এখনো তাকিয়ে আছে দেখে অস্বস্তি লাগছে, উঠে দাদুর রুমের দিকে পা বাড়ালাম। আচ্ছা নীরব কি সত্যি আমাকে ভালোবাসে নাকি জাস্ট ফাজলামো করছে? এসব ভাবতে ভাবতে দাদুর রুমে চলে আসলাম, দাদু দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে দাদির ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমি: দাদু?
দাদু: নাতবৌ আয় আয়।
আমি: দাদির ছবির সাথে প্রেম করছিলে বুঝি?
দাদু: ভালোবাসা কি আর পুরোয়, আগে যেমন ভালোবাসতাম এখনো বাসি।
আমি: বাব্বাহ্ কি খাটি প্রেম।
দাদু: দুদিনের এই দুনিয়ায় মিথ্যে ভালোবেসে লাভ কি? সত্যিকারের ভালোবাসার জন্যই তো সময়টা খুব অল্প মনে হয়।
আমি: দাদিকে খুব ভালোবাস তাই না?
দাদু: হ্যাঁ তুই যেমন আদিলকে ভালোবাসিস।
আমি: (নিশ্চুপ)
দাদু: মন খারাপ করিস না ভালোবাসা জিততে শিখ। দিদিরে জীবনটা খুব অল্প সময়ের, এর মধ্যে যদি মান অভিমান করে কাটিয়ে দিস তাহলে ভালোবাসবি কখন?
আমি: ভালোবাসা তো এক তরফা হয় না দাদু।
দাদু: মানছি ভালোবাসা এক তরফা হয় না কিন্তু এটাও তো সত্যি প্রথমে একজনের মনেই ভালোবাসার জন্ম নেয় তারপর তার ভালোবাসার স্পর্শে অপর মানুষটির মনেও ভালোবাসা জন্ম নেয়। দুজনের মনে একসাথে ভালোবাসা জন্ম নেয় না, কোনো একজনকে অন্যজনের ভালোবাসা জয় করে নিতে হয়।
আমি: চাইলেই কি জয় করা যায়?
দাদু: হাল ছেড়ে দিলে হয় না চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
আমি: হুম।
দাদু: রাগ অভিমান ভুলে আদিলের ভালোবাসা জয় করে নে দেখবি জীবনে অন্যরকম এক সৌন্দর্য খুঁজে পাবি, ভালোলাগা কাজ করবে, বারবার ওকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে হবে, ওর সাথে সহস্র শতাব্দী থাকার ইচ্ছে জাগবে মনে।
আমি: (নিশ্চুপ)
দাদু: আমার কথা শুনে আর একবার ট্রাই করে দেখ, হয়তো আদিলের ভালোবাসা জয় করে নিতে পারবি।
দাদুর দিকে তাকালাম, সত্যি কি আমি আদিলের ভালোবাসা জয় করতে পারবো?

মাঝরাতে হঠাৎ গালের মধ্যে টুপটুপ করে পানি পড়ার স্পর্শে ঘুম ভেঙে গেল, চোখ বোজেই বুঝার চেষ্টা করলাম পানি কোথা থেকে পড়ছে। একটা হাত খুব যত্ন করে আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, আমার গালে টুপটুপ করে কারো চোখের পানি পড়ছে আর গরম নিঃশ্বাস পড়ছে। বুঝলাম আদিল আমার পাশে শুয়ে আছে কিন্তু ও কাঁদছে কেন? আর ও তো আজ সোফায় ঘুমিয়েছিল। চোখ বোজেই শুয়ে রইলাম আদিল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বিড়বিড় করছে।
আদিল: কেন যে পাগলামো করো, জ্বর গায়ে বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছিলে কেন? কতো গুলো থাপ্পড় দিয়েছি আঙ্গুলের দাগ পড়ে গেছে গালে। (ভালোবাসে না আবার আমাকে কষ্ট দিয়ে নিজেই কাঁদে। আচ্ছা সন্ধ্যার সময় কি ও এজন্যই কাঁদছিল?)
আদিল: গাল দুটু তো লাল হয়ে আছে কি যে করি... (আদিল আলতো করে আমার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো)
আমি: আমি কিন্তু ঘুমে না সব শুনে ফেলেছি। (আমার কথা শুনে আদিল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে, কি করবে বুঝতে না পেরে মাথা চুলকাচ্ছে আর আমি ওর মুখের এই হাল দেখে হাসছি)
আমি: চোর ধরা পড়েছে হিহিহি।
আদিল: খুব হাসি পাচ্ছে তাই না?
আদিল আমাকে ওর দিকে ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমি চুপচাপ ওর বুকে মুখ গুঁজে দিলাম। আদিল আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদছে, আজ কেন যেন ওর কান্না শুনতেও ভালো লাগছে। আজ মনে হচ্ছে আদিল আমাকে সত্যিই ভালোবাসে, ভালো না বাসলে কি আমাকে কষ্ট দিয়ে নিজে আবার কাঁদে...

চলবে😍
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url