তবুও ভালোবাসি | পর্ব -১৯



চোখে রোদের আলো পড়তেই ঘুম ভেঙ্গে গেল, মিটমিট করে তাকিয়ে দেখি ফুফু জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। সারারাত কান্না করে ভোররাতে ঘুমিয়েছি বড্ড ক্লান্ত লাগছে।
আমি: ফুফু আর একটু ঘুমাই প্লিজ!
ফুফু: এমন ঘুম কাতুরে মেয়ে নাকি আবার বাবার অফিস সামলাবে।
আমি: সামলাবো তো দেখো আমি ঠিক পারবো।
ফুফু: আমিও তো চাই তুই এসবে নিজেকে ব্যস্ত রাখ আর ভুলে যা অতীতের কষ্ট গুলো।
আমি: এসব মনে করো নাতো, আমি সব ভুলে গেছি। আজ থেকে নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখবো।
ফুফু: এবার ফ্রেশ হয়ে নিচে আয় সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে। (দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম নয়টা বাজে এতোক্ষণে তো সব গুলো ফাইল নিয়ে ভাইয়ার চলে আসার কথা)
আমি: ভাইয়া এসেছে?
ফুফু: সিহাবের তো কোনো খুঁজ নেই, রাতে বেরিয়ে গিয়েছিল তারপর থেকে ওর ফোন সুইচড অফ বলছে।
আমি: দেখেছ এই ছেলে নিশ্চয় হিসাবে কোনো গণ্ডগোল লাগিয়ে রেখেছে।
ফুফু: সেটা তো তুই অফিসে গেলেই খুঁজে বের করতে পারবি।
আমি: হুম আজই যাবো, তুমি যাও আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
ফুফু: ঠিক আছে।
ফুফু চলে যেতেই উঠে ফ্রেশ হতে গেলাম।

তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে রুমে আসলাম হঠাৎ আয়নার দিকে নজর পড়লো, আয়নায় নিজেকে দেখে মৃদু হাসলাম। কিছুক্ষণ আগে ফুফুকে বলেছি আমি সব ভুলে গেছি আসলেই কি ভুলে গেছি? এখনো মন আদিলকে মিস করছে। সবার সামনে আমি চেঞ্জ হয়ে গেছি বলে অভিনয় করছি কিন্তু সত্যিই কি আমি নিজেকে চেঞ্জ করতে পেরেছি? চাইলেই কি ভালোবাসা ভুলে নিজেকে চেঞ্জ করে নেয়া যায়? ভুলে গেছি শব্দটা শুধু মুখেই বলা সম্ভব মন থেকে নয়। নিজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে নিচে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম।

আব্বু: গুড মর্নিং আম্মু।
আমি: গুড মর্নিং।
চাঁচি: আজ আনিশাকে অনেক ফ্রেশ লাগছে ব্যাপার কি? (তোমরা তো উপরটা দেখছ তাই এই কথা বলতে পারছ, আমার মনের ভিতর যে কি ঝড় বইছে সেটা তো কেউ দেখতে পারছ না)
ফুফু: কিরে চুপ হয়ে গেলি যে?
আমি: কোথায় নাতো, খাবার দাও।
ফুফু: হ্যাঁ দিচ্ছি।
আমি: চাঁচি তোমার গুণধর ছেলে ফোন নাকি সুইচড অফ করে রেখেছে?
চাঁচি: কেন সুইচড অফ আছে সেটা তো বলতে পারছি না।
আমি: তোমার সাথে যোগাযোগ করলে বলে দিও ফোন সুইচড অফ করে রেখে ও বাঁচতে পারবে না, হিসাব তো ওকে দিতেই হবে।
আব্বু: আজ অফিসে যাবি? (আব্বুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলাম)
আমি: হ্যাঁ আজ থেকেই আমার নতুন পথ চলা শুরু।
আব্বু: ঠিক আছে আজ আমিও যাবো।
ফুফু: তুমি এই শরীর নিয়ে কেন যাবে আবার?
আব্বু: প্রথম দিন যখন আনিশাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো সবকিছু বুঝিয়ে দিবো।
আমি: ঠিক আছে কিন্তু আজকেই শুধু।
আব্বু: আচ্ছা।

রেডি হয়ে আব্বুকে নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আজ অফিসে প্রথম যাচ্ছি এতো কষ্টের ভীড়েও কেমন যেন একটা ভালো লাগা কাজ করছে এইটা ভেবে যে আব্বুর সবকিছুর দায়িত্ব আমি নিচ্ছি আব্বুকে কিছুটা হলেও টেনশন মুক্ত করতে পারবো।

অফিসে পৌঁছে আব্বু সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন তারপর আমাকে রুমে নিয়ে আসলেন। রুমের চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখছি।
আব্বু: জানিস আনিশা আমার খুব ইচ্ছে ছিল এই চেয়ারে বসার অধিকার রাইমার হাজবেন্ডকে দিব। (আব্বুর কথা শুনে আব্বুর দিকে তাকালাম, আব্বুর দুচোখে পানি টলমল করছে)
আব্বু: আমিতো সবসময় ভাবতাম আমার দুই মেয়ের জামাইকে আমার যা আছে সবকিছু ভাগ করে দিব, দুজন মিলে সব সামলাবে আমার মেয়েরা সুখে থাকবে আর আমি সেসব প্রাণ ভরে দেখবো।
আমি: (নিশ্চুপ)
আব্বু: কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম খেলা দেখ রাইমা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। ভেবেছিলাম তোকে বিয়ে দিয়ে তোর সুখ দেখে বুঝি মরতে পারবো কিন্তু তা আর হলো না। চোখের সামনে সব স্বপ্ন গুলো একে একে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
আমি: আব্বু প্লিজ আজ অন্তত কেঁদো না। আমি নিজের ইচ্ছায় সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছি তুমি খুশি হওনি?
আব্বু: অনেক খুশি হয়েছি রাইমা থাকলে আজ অনেক খুশি হতো। আমার এই চঞ্চল মেয়েটা যে সবকিছু নিজের কাধে তুলে নিবে আমিতো কখনো ভাবতেই পারিনি।
আমি: দেখো আমি সবকিছু কেমন সামলে নেই।
"স্যার আসবো" (কথাটা শুনে দরজায় তাকালাম একজন বুড়ো লোক দাঁড়িয়ে আছে, উনাকে দেখে দাদুর কথা মনে পড়ে গেল, জানিনা দাদু কেমন আছেন)
আব্বু: এখনো তুমি দেরি করে আস? আনিশা ও হচ্ছে আমাদের পিয়ন, প্রতিদিন দেরি করে অফিসে আসে। ওর এই অভ্যাস সবাই জানে তাই কেউ বকে না, তুই আবার বকতে যাস না ও আমাদের অফিসের সবচেয়ে পুরনো লোক।
আমি: প্রতিদিন দেরি হয় কেন?
পিয়ন: আসলে অনেক দূরের বস্তিতে থাকি তো রিকশা দিয়ে আসতে দেরি হয়ে যায়।
আমি: রিকশা?
আব্বু: হ্যাঁ ওর রিকশা আছে অফিস শেষে ওটাই চালায়।
আমি: অফিসের পর তো এমনিতেই শরীর ক্লান্ত হয়ে পরে তারপর আবার রিকশা চালানো এই বুড়ো বয়সে?
পিয়ন: মেয়েটা মেডিকেলে পড়ে আর ছেলেটা এইবার এস.এস.সি দিবে অনেক খরচ তো। (অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি উনার দিকে একটা মানুষ ছেলে মেয়ের জন্য এতোটা কষ্ট করছেন?)
আব্বু: কিরে কি ভাবছিস?
আমি: ভাবছি এই পিয়ন দাদুকে আমরা কোনো সাহায্য করলে কেমন হয়।
আব্বু: কি সাহায্য?
আমি: বেতন বাড়িয়ে দিবো যেন অফিস শেষে আর রিকশা চালাতে নাহয়।
আব্বু: কিন্তু...
আমি: আব্বু অফিসের বয়স্ক লোক যারা আছেন উনাদের জন্য কিছুটা বেতন বাড়িয়ে দিলে আমাদের খুব একটা ক্ষতি হবে না।
আব্বু: তোর মতো বড় মনের মানুষের সাথে কিভাবে যে এতো খারাপ কিছু হলো আমি ভেবে পাই না।
আমি: সবার কপালে কি আর সব সুখ সয় আব্বু?
আব্বু: তোর যা ভালো মনে হয় তুই কর।
আমি: ঠিক আছে তুমি বাসায় চলে যাও।
আব্বু: ঠিক আছে। (আব্বু চলে যেতেই পিয়ন এসে আমার সামনে হাসি মুখে দাঁড়ালেন, উনাকে যতো দেখছি ততোই দাদুর কথা মনে পড়ছে। জানিনা ওই বাসার লোক গুলোকে কেন ভুলতে পারছি না, সবার উপর কেমন যেন মায়া জন্মে গেছে)
পিয়ন: স্যার ঠিকই বলেছেন আপনি সত্যি অনেক বড় মনের মানুষ।
আমি: আপনাকে পিয়ন দাদু বলে ডাকতে পারি? (উনি হাসি মুখে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন)
আমি: আর রিকশা চালাতে হবে না এই মাস থেকে আমি বেতন বাড়িয়ে দিবো।
পিয়ন: ঠিক আছে। (চেয়ারে এসে বসতেই উনার দিকে নজর পড়লো, চলে যেতে চেয়েও কেমন যেন ইতস্তত বোধ করছেন)
আমি: কিছু বলবেন?
পিয়ন: হ্যাঁ আপনি যখন এসেছেন তখন...
আমি: এতো ভয় পাচ্ছেন কেন কি বলার আছে বলুন আর আমাকে তুমি করেই বলুন।
পিয়ন: বড় স্যারের হার্ট এ্যাটাকের কথা শুনেছিলাম তাই কিছু ভয়ে জানাতে পারিনি কিন্তু আজ যখন আপনি সবকিছুর দায়িত্ব নিয়েছেন আমার মনে হয় আপনাকে জানানো প্রয়োজন।
আমি: কি জানানো প্রয়োজন স্পষ্ট করে বলুন।
পিয়ন: সিহাব স্যারের ব্যবহার আমার ভালো লাগছে না আপনি একবার সবকিছুর হিসাব করুন আর আপনাদের সব সম্পত্তির দলিল গুলো একবার দেখুন।
আমি: হিসাব নাহয় করবো কিন্তু দলিল দেখতে বলছেন কেন?
পিয়ন: কিছুদিন আগে আমি সিহাব স্যারের টেবিলে কিছু ফাইল আর সাথে কিছু দলিল দেখেছিলাম, আমি ভালো করে দেখার আগেই উনি সরিয়ে নিয়ে আমাকে ধমক দেন। আমার সন্দেহ যদি ভুল নাহয় তাহলে আমি শিওর উনি আপনাদের সম্পত্তি নিজের নামে করে নিয়েছে।
আমি: কি বলছেন কিন্তু কিভাবে সম্ভব?
পিয়ন: আমিতো এইটাও জানিনা এই কোম্পানিটা আদৌ আপনাদের নামে আছে কিনা, অনেক বছর ধরে এখানে কাজ করছি আপনাদের কোনো ক্ষতি হউক সেটা আমি চাই না। (উনার কথা কেন যেন বিশ্বাস করতে পারছি না কিন্তু একেবারে যে বিশ্বাস না করে উড়িয়ে দিবো সেটাও পারছি না কারণ ভাইয়ার ব্যবহার আমার ঠিক লাগছে না)
পিয়ন: আপনি একবার খুঁজে দেখুন সবকিছু। আর ম্যানেজার এর সাথে সিহাব স্যারের ভালো সম্পর্ক আছে দুজন মিলে ইচ্ছেমত টাকা সরায়।
আমি: ম্যানেজারের ব্যবস্থা আমি করছি উনাকে ডেকে নিয়ে আসুন।
পিয়ন: ঠিক আছে।

ভাইয়ার একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন দিন দিন উনার সাহস বেড়েই চলেছে। সেদিন আদিলকে মারলো অথচ... কিছু ফাইল দেখছিলাম নিজের অজান্তেই আদিলের কথা মনে পড়ে গেল, নিশ্চুপ হয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছি। কেন যে আদিলকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারছি না, আমারই বা দোষ কি বিয়ের সম্পর্ক তো আর ঠোনকো কোনো সম্পর্ক নয় যে চাইলেই ভুলা যায়।
পিয়ন: মেডাম? (ডাক শুনে দরজায় তাকালাম পিয়ন দাঁড়িয়ে আছে সাথে ম্যানেজার)
আমি: আসুন।
ম্যানেজার: আমাকে ডেকেছেন?
আমি: হ্যাঁ আপনার জামাই আদরের ব্যবস্থা করবো।
ম্যানেজার: মামামাননে?
আমি: এখন তোতলাচ্ছেন কেন টাকা সরানোর সময় মনে ছিলনা? এতো গুলো টাকা কোথায়?
"আমি বলছি" (কথাটা শুনে সামনে তাকালাম একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, কে ও?)
পিয়ন: ও প্রান্ত, সিহাব স্যারের অনুপস্থিতিতে ও সবকিছু দেখাশোনা করে। বড় স্যার এর খুব বিশ্বস্ত আর পছন্দের ও।
আমি: ওহ!
প্রান্ত: সেদিন আমি আপনাদের বাসায় গিয়েছিলাম স্যারকে সবকিছু জানানোর জন্য কিন্তু স্যার কিছুটা অসুস্থ আছেন তাই বলতে পারিনি। আজ তো আপনাকে বলতে কোনো বাধা নেই।
ম্যানেজার: প্রান্ত বাড়াবাড়ি করছ কিন্তু।
প্রান্ত: কিছুটা বাড়াবাড়ি তো করতে হবেই। মেডাম এই সিসি টিভির ফুটেজে ম্যানেজার আর সিহাব স্যার এর টাকা সরানোর ভিডিও আছে। এই ফাইলে সবকিছুর হিসাব আছে। আমি খুঁজ নিয়ে দেখেছি আপনাদের টাকা নিয়ে সিহাব স্যার নতুন দুটি প্রজেক্ট শুরু করেছেন।
আমি: কি?
প্রান্ত: এখন ব্যবস্থা না নিলে উনি হয়তো একদিন আপনাদের পথে বসাবেন।
আমি: আব্বুর চোখের আড়ালে এতোকিছু হচ্ছে?
প্রান্ত: সিহাব স্যারের ব্যবস্থা আপনি করুন আর আমি এই ম্যানেজার এর ব্যবস্থা করছি।
আমি: উনাকে পুলিশে দিন আর খুব শীঘ্রই নতুন ম্যানেজার এর জন্য নিয়োগ দিন।
প্রান্ত: ঠিক আছে।
আমি: আমি আসছি।
তাড়াতাড়ি আব্বুকে সব জানানো প্রয়োজন এমনিতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে, বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

বাসায় পৌঁছে কলিংবেল চাপতেই ফুফু এসে দরজা খুলে দিলেন। ড্রয়িংরুমে আব্বু, চাঁচি, তানিয়া, ফারজানা সবাই বসে গল্প করছে।
আমি: কিরে তোরা কখন এলি?
তানিয়া: অনেক্ষণ হয়েছে।
ফারজানা: তোর তো কোনো খোঁজই পাওয়া যায় না। (দুজন একসাথে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, সত্যি এতোসব ঝামেলায় ওদের এতটুকুও সময় দেওয়া হয়নি)
আমি: কতোদিন পর তোদের সাথে দেখা হলো।
তানিয়া: তোর সাথে অনেক গল্প করার আছে রুমে চল তো।
আমি: তোরা যা আমি আব্বুর সাথে একটু কথা বলে আসছি।
তানিয়া: ঠিক আছে। (ওরা আমার রুমে চলে যেতেই আব্বুর পাশে এসে বসলাম)
আব্বু: কিরে এই দুপুর বেলায় বাসায় চলে আসলি অফিসে ভালো লাগে না?
আমি: আব্বু আমাদের সবকিছুর দলিল গুলো কোথায়?
আব্বু: হঠাৎ দলিল দিয়ে কি করবি?
আমি: ভাইয়া আমাদের টাকা চুরি করে নতুন প্রজেক্ট শুরু করেছে, আমার তো এবার মনে হচ্ছে আরো অনেক কিছু ও নিজের নামে করে নিয়েছে।
আব্বু: কি বলছিস?
চাঁচি: আনিশা ও তোর চাচাতো ভাই হয় এসব ওর সম্পর্কে কি বলছিস?
আমি: আমার কাছে প্রমাণ আছে চাঁচি, ম্যানেজারের ব্যবস্থা করে এসেছি।
ফুফু: সিহাব এমন বেঈমানি করতে পারলো?
আমি: সবগুলো দলিল আমি দেখতে চাই, ফুফু তুমি এগুলো বের করে আনো আমি ততক্ষণে তানিয়া আর ফারজানার সাথে একটু কথা বলি।
ফুফু: ঠিক আছে।

আমি: তানিয়া... (রুমে ঢুকে ওকে ডাক দিতেই আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলো, সারাদিনের চেপে রাখা কান্না আর বোধহয় দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়)
ফারজানা: নিজের কি অবস্থা করেছিস আনিশা? তুই তো এমন ছিলিস না।
আমি: ভালোবাসা যখন হারিয়ে যায় তখন কি নিজেকে ঠিক রাখা যায়?
তানিয়া: আঙ্কেল আমাদের সবকিছু বলেছেন, আমার কি মনে হয় জানিস আদিল ভাইয়া কোনো প্রবলেমে আছে। উনার মা হয়তো কোনো প্রবলেম করেছে যার কারণে উনি...
আমি: ভালোবাসলে এসব প্রবলেম কোনো বাধা হতো না। হয়তো ও আমাকে ভালোই বাসে না।
ফারজানা: ভুল করছিস ভাইয়ার সাথে আমার কথা হয়েছিল তোর বার্থডের দিন, যতটুকু বুঝেছি ভাইয়া তোকে খুব ভালোবাসে।
আমি: তাহলে আমার কাছে ফিরে আসে না কেন? আব্বুকে ওর মা অপমান করল কেন?
ফারজানা: কাঁদিস না সবকিছুর পিছনে কোনো একটা কারণ তো অবশ্যই আছে তুই ভালো করে খুঁজে দেখ ঠিক বুঝতে পারবি।
তানিয়া: আর তুই এতো ভেঙ্গে পড়ছিস কেন আমরা আছিতো। তুই আজই ফোন কিনবি আমরা সবসময় তোকে ফোন করবো তাহলে নিজেকে একা মনে হবে না।
আমি: তোরা কি চলে যাবি?
তানিয়া: হ্যাঁ অনেক্ষণ হলো এসেছি বাসায় আম্মু টেনশন করবেন।
আমি: ঠিক আছে।
তানিয়া: নিচে চল।

তানিয়া আর ফারজানা সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল, ওরা দরজা খুলতেই ভাইয়া এসে ভিতরে ঢুকলো। তানিয়া আর ফারজানা ভাইয়াকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আব্বুর হাতের দিকে নজর পড়লো দলিল গুলো আব্বুর হাতে।
আমি: এখানে সবগুলো আছে তো?
ফুফু: নারে নেই।
আমি: মানে?
ভাইয়া: থাকবে কিভাবে সবগুলো তো আমার হাতে, শুধু তাই নয় এই বাড়ি আর কোম্পানি বাদে বাকি সব এখন আমার নামে।
আব্বু: কখন নিলি দলিল গুলো আর তুই আমার সাথে এমন করতে পারলি?
ভাইয়া: এতো বছরের পারিশ্রমিক তো নিতেই হতো। দলিল গুলো অনেক আগেই নিয়েছিলাম নতুন দলিল তৈরিও করেছিলাম কিন্তু তোমার সিগনেচার নিতে পারছিলাম না কারণ তুমি কোনো কিছুতে সিগনেচার দেওয়ার আগে ভালো করে পড়ে তারপর সিগনেচার দাও। আনিশার বিয়ের দিন ওকে বিদায় দেওয়ার ঠিক পর মুহূর্তে তুমি কাঁদছিলে আর আমি তখন কিছু পেপারস এনে বলেছিলাম সিগনেচার গুলো খুব প্রয়োজন, সেদিন পেপারস গুলোর সাথে দলিলও ছিল আর তুমি এতোটাই ভেঙে পড়েছিলে যে না পড়েই সিগনেচার করে দাও, ব্যস সবকিছু ওখন আমার। এই বাড়িটা আর কোম্পানির প্রতি খুব ইচ্ছে ছিল কিন্তু আফসোস বাড়িটা রাইমার নামে আর কোম্পানি আনিশার নামে। এই দুটু ছাড়া বাকি সব এখন আমার হাতে।
আব্বু: সিহাব?
আমি: আব্বু আস্তে, তুমি উত্তেজিত হলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। ওর বিচার আমরা নয় চাঁচি করবেন, দেখি চাঁচি কি বিচার করেন।
চাঁচি: সিহাব এসব তুই কি বলছিস?
ভাইয়া: সব সত্যি আম্মু।
চাঁচি: তুই আমার ছেলে যে এইটা ভাবতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে।
ভাইয়া: আম্মু তুমি না সবসময় ভালো মানুষী কর।
চাঁচি: এতোদিন ভালো ছিলাম তোকে ভালোবেসেছিলাম আজ আমার শাসন দেখবি।
ভাইয়া: কি করবে আম্মু?
চাঁচি: তোর নামে তো এখনো কিছু দেইনি তাই না?
ভাইয়া: তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?
চাঁচি: উঁহু ওয়ার্নিং দিচ্ছি দু সপ্তাহের মধ্যে তুই ভাইয়ার সবকিছু পুনরায় ভাইয়ার নামে করে দিবি নাহলে তোর আব্বুর যা কিছু আছে সব আমি আনিশার নামে দিয়ে দিবো।
ভাইয়া: আম্মু..
চাঁচি: মনে রাখিস দু সপ্তাহ মাত্র, সামান্য সম্পত্তির জন্য নিশ্চয় তোর আব্বুর বিশাল সম্পত্তি হাত ছাড়া করবি না?
ভাইয়া: ঠিক আছে আমি ফিরিয়ে দিবো।
চাঁচি: গুড বয়, আর হ্যাঁ তোর মতো লোভী ছেলের কাছে আমি আর ফিরে যাচ্ছি না আমি এখানেই থাকবো।
ভাইয়া: আম্মু এবার কিন্তু...
চাঁচি: দরজা খুলা আছে এই বাসা থেকে বেরিয়ে যা। (ভাইয়া চুপচাপ মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল, যাক চাঁচি অন্তত সঠিক বিচার করেছেন)
চাঁচি: ভাইয়া সিহাবের হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি ওকে...
আব্বু: ও তো আমার ছেলেই বাদ দাও।
ফুফু: সিহাব এমন করবে আমি কখনো ভাবিনি।
আব্বু: যা হবার হয়েছে এসব নিয়ে আর যেন কোনো কথা নাহয়।
ফুফু: ঠিক আছে।
সবাই একে একে যার যার রুমে চলে গেল, আমিও রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম।

সিঁড়িতে উঠতেই ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো চমকে উঠে পিছন ফিরে ফোনের দিকে তাকালাম। ফোন তো যে কেউ দিতে পারে কিন্তু আমার বুক এমন ধুকপুক করছে কেন? আশেপাশে কেউ নেই তাই আমিই ফোন রিসিভ করলাম।
আমি: হ্যালো।
আদিল: আনিশা..(চমকে উঠলাম আদিলের কন্ঠ শুনে, কেন ফোন করেছে ও?)
আমি: কেন ফোন করেছ?
আদিল: না মানে...
আমি: ভালোই যখন বাস না তাহলে মাঝেমাঝে আশার আলো দেখাও কেন?
আদিল: ভালোবাসি না?
আমি: না বাসো না, যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসতে তাহলে মায়ের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে।
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: তোমাকে স্পষ্ট ভাবে বলে দিচ্ছি আমাকে ফোন করো না, আমি আমার একা জীবন নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছি প্লিজ আর এলোমেলো করতে এসো না।
ফোন রেখে দিলাম, ভালোবাসে না আবার ফোন করেছে। আর কখনো তোমাকে ফোন করবো না তোমার সামনে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করবো না। আনিশা এখন অবহেলা সহ্য করে একা বাঁচতে শিখে গেছে। একাই বাঁচবো আমি, প্রয়োজন নেই আর কোনো মিথ্যে ভালোবাসার...

চলবে😍
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url