Breaking News

রুপের তরী । পর্ব - ০১

সৎ বোনের পছন্দ নয় বলে মাথার সব চুল আজ কেটে দিল আমার সৎ মা। অনেক কান্নাকাটি করার পরও আমার একটা কথাও শুনলেন না উনি।

রূপ জিনিসটা কার পছন্দ নয়?সবাই রূপবতী তরুণী পছন্দ করেন।অনেকে চান সুন্দরী হতে।
কিন্তু আমার কাছে রূপবতী হওয়া একটা অভিশাপ।
নিজের চেহারার জন্য আমি অভিশপ্ত।আমার সৎ মা এবং বোন সবসময় আমার রূপের হিংসা করেন।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, ওইসব মেয়েদের মত আমার মুখেও কেন এসিড ছুঁড়ে মারে না।

চুল কাটা শেষ হয়ে গেলে তরীর হাত টান মেরে ফেলে দেওয়া হয় উঠোনের এককোনে।
সৎ মা ও বোন হাসতে হাসতে বাড়ির বাইরে চলে যায়। তরী সেখানেই বসে কাদতে থাকে।
এ জন্য নয় যে তার চুলগুলো কেটে দেওয়া হয়েছে,
সে কাঁদছে যে বাবা বারান্দায় বসে থেকেও কিচ্ছুটি বলল না।।

তরী গ্রামের একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।কাছের মানুষ বলতে তার কেউ নেই।
তরীর বয়স তিন কি চার হতে না হতেই মা কলেরায় আক্রান্ত হয়ে একরাতের মাঝেই মারা যায়।
বাবা সে সময় মেয়ের চিন্তাতেই আরেকটা বিয়ে করে নিয়ে আসেন।
তবে কিছুদিন যাওয়ার পর সৎ মায়ের প্ররোচনায় এসে বাবা আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেন।
সৎ মা তরীর যত্ন নিতেন না। বিশেষ করে নিজের একটা মেয়ে হওয়ার পর।
তরীর চেহারা ওর সৎ বোনের চেয়ে অনেক ভালো হওয়ায় সৎ মায়ের এতে অনেক হিংসে হতো।

তরীর বয়স এখন উনিশ এর কাছাকাছি। ওর ছোট বোনের বয়স পনের কি ষোল হবে হয়ত।
তরীর চেয়ে কম সুন্দরী হওয়ায় অনেকটা হিংসে হয় ওর।
সে জন্যই তো আজ তরীর মাথার সব চুল মাকে দিয়ে জোড় করে কেটে দিল।
মা মেয়ে অনেকটা খুশি আজ তরীর এমন অবস্থা দেখে।
তরীর কিচ্ছু করার নেই। কারন কিছু বলতে গেলে এ বাড়ির বাসি ভাতও যে তার কপালে জুটবে না।

কাটা চুলগুলো হাতে তুলে নিয়ে বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে চলে আসে তরী।
পুকুর পাড়ের ওপর একটা বাকানো খেজুর গাছ আছে।
পুকুরে পানির ওপর দিয়েই কিছুটা বাকা হয়ে আছে গাছটি।
এখানে প্রায়ই এসে বসে থাকে সে। হাতে থাকা কাটা চুলগুলো নিয়ে গাছের ওপর গিয়ে বসে তরী।
পা পানির ওপর মেলে দিয়ে কাটা চুলগুলো সামনে ধরে সে।
নিজের এমন অবস্থার জন্য সে নিজের বাবাকে কখনো দোষারোপ করে না।
সে দোষারোপ করে নিজের মাকে।

আচ্ছা মা কি আমাকেও নিয়ে যেতে পেরেছিলেন না?স্বার্থপরের মতো একা একা শান্তির
ঘুম ঘুমোতে চলে গেলেন? নাকি আমি ওনার বোঝা হয়ে গেছিলাম যে এত
তাড়াতাড়ি আমায় একা করে চলে গেলেন?
হাতে থাকা চুলগুলো সহ পুকুরে শোঁ করে তলিয়ে গেল তরী।
সাঁতার সে জানে। তবে আজ আর সাতার কাটার ইচ্ছে নেই তার।
এই গভীর পুকুরটাতে তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে আজ ওর।
কিন্তু কতায় আছে না? অভাগী যেখানে যায় সাগর শুকিয়ে যায়।
এবারও এমন হলো। ঠিকমতো সে ডুবেও মরে যেতে পারলে না।
তার আগেই একজন পুকুরে ঝাপ দিয়ে তরীকে তুলে আনলো।
তরীদের গ্রামটা আসলে লালমনিরহাটের কুলাঘাটে। যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধরলা নদী।
জায়গাটা বেশ লোকপ্রিয় হওয়ায় বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন ঘুরতে আসে সেখানে।
তরীদের বাড়ির পেছন পাশ দিয়ে রাস্তা গেছে ।
এমনিই ঘুরতে আসা লোকজনের মাঝে কেউ একজন তরীকে ডুবতে দেখে ফেলে।
এরপর তরীকে উদ্ধার করে ঘাটে আনে।

তরীকে কোলে করে ওদের বাড়িতে নিয়ে আসে।
যে তরীকে তুলে আনলো তার বয়স হয়তো চল্লিশ পয়তাল্লিশের কাছাকাছি হবে।
তবে দেখে মনে হয় একদম সুস্থ সবল মানুষ।
উনিই তরীর সুস্থতার খেয়াল করে নিজের গাড়িতে থাকা কিছু ঔষধ তরীকে খাইয়ে দিলেন।
তরীর বাবা পাশেই ছিলেন। লোকটির এমন পরিচর্যা দেখে তীর বাবা বেশ লজ্জিত হলেন।
লোকটিকে দেখে মনে হলো উনি একজন ডক্টর।
যাই হোক তরীর জ্ঞান ফিরার আগেই লোকটি তরীর বাবার কাছে বিদায় নিলেন।
বাড়িতে তরীর সৎ মা ও বোন ছিল না এতক্ষণ।

তরীর জ্ঞান ফিরলে নিজেকে বারান্দার ছোট্ট চৌকিতে আবিষ্কার করলো।
পাশেই ওর সৎ মা ও বোন দারিয়ে আছে। ওর জ্ঞান ফিরতে দেখলেই বলে,
--মরন!অভাগী মরেও না। কোত্থেকে যে ওসব ফিরিশতা আইসে পরে।
হ্যা গো,এট্টু আগে ডুব দিতে পারস নাই?নাকি আগে লোকজন দেইখা
ফের ডুব দিসস?যাতে তোরে কেউ আইসা বাচায়?
তরী এসবের মানে কিছুই বুঝতে পারলো না।প্রচুর মাথ ব্যাথা করছে।
মাথায় ভেজা ওরনা পেচিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেল।
তরী গরীব ঘরের মেয়ে হলে কি হবে, পড়াশুনায় প্রচুর মেধাবী।
পড়াশুনা ওর সৎ মা চেয়েও আটকাতে পারেনি। কারন ছোট থেকেই বৃত্তি
পাওয়ায় আর এ ব্যাপারে কারও সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে নি ওর।
এসএসসিতেও অনেক ভাল রেজাল্ট করেছিল।
শহরের একটা নামীদামী স্কুলে পড়ারও সুযোগ পেয়েছিল সে।
তবে পরিবারের চাপে এসে যেতে পারেনি।তাই গ্রামেরই একটা কলেজে ভর্তি হয় সে।
এখন উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ছাত্রী সে।

চার কি পর হবে হয়ত,তরীর বাবা উঠোনে বসে কুলোয় গুনের তার দিয়ে গিট লাগাচ্ছিল।
সে সময় সেদিনের মধ্যবয়স্ক লোকটি তরীর বাবার সামনে এসে দাড়ায়।
তরীর বাবা লোকটিকে দেখে চমকে যায়। উঠে দাড়িয়ে সালাম দেয়,
-আসসালামু আলাইকুম,
-জ্বি ওয়ালাইকুম আসসালাম।
-কিছু কইবেন সাহেব?
"জ্বি,আপনার মেয়েকে আমি আমার বাড়ির বউ বানিয়ে নিয়ে যেতে চাই। "!!

চলবে...

No comments

info.kroyhouse24@gmail.com